৬ মাসের প্রশিক্ষণে চিকিৎসক!

ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসকের ভুল—হরহামেশা এমন সংবাদ চোখে পড়ে। আদতে ভুলের সঠিক কারণ নির্ণয় কঠিন। তবে, এ-ও সত্য ‘ভুয়া’ চিকিৎসকের কারণে অনেকের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। স্বীকৃতি না থাকলেও তারা স্বাস্থ্যসেবায় প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন; ‘ডিগ্রিধারী চিকিৎসক’ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সনদ ছাড়াই যারা নামের আগে ব্যবহার করেন পদবি।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, মূলত যারা এসব কাজে জড়িত, তারা পল্লিচিকিৎসক বা গ্রামীণ ডাক্তার। গ্রাম এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদেরকে প্রশিক্ষিত করে তোলে। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ৬ মাস থেকে ১ বছর মেয়াদি কোর্স করে তারা সাধারণ রোগ শনাক্ত, প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়ার বৈধতা পান।
কিন্তু দেশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে আছে এমন চিকিৎসক নামধারীরা। অনেকের আছে ব্যক্তিগত চেম্বার। ব্যবহার করছেন সিল ও প্যাড। এমনকি কেউ কেউ অস্ত্রোপচারের ঝুঁকিও নেন। যদিও জ্বর, সর্দি, কাশি, পেটব্যথা, সাধারণ কাটাছেঁড়া, প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসায় সাহায্য ছাড়া গুরুতর বা জটিল রোগীদের হাসপাতালে রেফার্ড করার নির্দেশ দেওয়ার বাধ্যকতা রয়েছে পল্লিচিকিৎসকদের।
কেস স্টাডিতে পল্লিচিকিৎসক
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় এক পল্লিচিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ ওঠে। রোগীদের সাতজন অভিভাবক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে এ সংক্রান্ত লিখিত অভিযোগটি দেন গত রোববার (৮ মার্চ)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত পল্লিচিকিৎসকের নাম হাফেজ মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ। উপজেলার বেলগাছি গগণ হরকরা মোড়ে বেলগাছি মেডিকেল হল নামে একটি চেম্বার রয়েছে তার। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। নামের আগে লিখেন ডাক্তার পদবি। ডাক্তার পরিচয়ে ২০২৩ সাল থেকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। ব্যবহার করছেন সিল ও প্যাড।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শিলাইদহ ইউনিয়নের বড় মাজগ্রামের তাসলিমা খাতুনের তিন শিশুর শরীরে চুলকানি দেখা দেয়। তিন মাস আগে ওষুধের জন্য ইব্রাহিমের কাছে যান তাসলিমা। ইব্রাহিম ‘আলফাকর্ট’ নামের একটি ইনজেকশন দেন। কয়েক দিনের মধ্যে তাসলিমার তিন মাস বয়সি মেয়ে তাইবা, তিন বছর বয়সি ছেলে রাফাত ও ছয় বছর বয়সি মেয়ে সুমাইয়ার মুখমণ্ডল ফুলতে শুরু করে। একই সঙ্গে তাদের মুখে লোম গজানো শুরু হয়।
তাসলিমা খাতুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, সন্তানদের অবস্থা দেখে আমি কুষ্টিয়া শহরের এক হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে যাই। ওই ডাক্তার আমাকে বলেন, ভুল চিকিৎসায় শিশুদের এমন হয়েছে। শিশুদের হরমোনজনিত রোগ হয়েছে। ভালো হতে সময় লাগবে। আমি ভুয়া ডাক্তার ইব্রাহিমের বিচার চাই।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, ছয় মাস আগে ইব্রাহিমের দেওয়া ‘আলফাকর্ট’ ইনজেকশনের প্রভাবের ভুক্তভোগী একই এলাকার মৌ খাতুনের দুই বছর বয়সি ছেলে ইউসুফ ও সাত বছর বয়সি মেয়ে মরিয়ম।
আরেক ভুক্তভোগী খাইরুল ইসলাম বলেন, নামের আগে চিকিৎসক লিখে ইব্রাহিম ভুল চিকিৎসা দিচ্ছে। তার ভুল চিকিৎসায় আমার ১৩ মাস বয়সি মেয়ে হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছে। মেয়েকে রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসা দিচ্ছি।
আলফাকর্ট কী ক্ষতিকর
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলফাকর্ট যে ধরনের ওষুধ এটা রোগীদের দেওয়ার বৈধতা পল্লিচিকিৎসকদের নেই। তারা এটির ব্যবহারবিধি বিষয়ে অভিজ্ঞ নয়।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন) চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল মামুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আলফাকর্ট এক ধরনের স্টোরায়েড ওষুধ। এটা ব্যবহার করলে দ্রুত ঠান্ডা, কাশি, জ্বর, চুলকানি কমে। তাৎক্ষণিকভাবে উন্নতি হয়। তবে এটার দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এটা বয়স অনুযায়ী দিতে হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে এটা দেওয়া যায় না।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
নিজের ভুল অস্বীকার করেছেন পল্লিচিকিৎসক ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ। তিনি বলেন, নিয়ম মেনে রোগীদের আলফাকর্ট ইনজেকশন দিয়েছি। আমি কুমারখালী হাসপাতাল থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০২৩ সাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আসছি। না বুঝে সিল, প্যাড ও ডাক্তার পদবি ব্যবহার করেছি।
কুমারখালীর ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, পল্লিচিকিৎসক ইব্রাহিমের ভুল চিকিৎসার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। তার চিকিৎসায় অন্তত ১০ শিশুর শরীরে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, পল্লিচিকিৎসকরা শুধু জ্বর, সর্দি, কাশি, পেটব্যথা, সাধারণ কাটাছেঁড়া, প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসা দিতে পারেন। ইনজেকশন বা গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসা দেওয়ার বৈধতা নেই। চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।