logo

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভেঙে দিলেন এনসিপি নেতারা

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভেঙে দিলেন এনসিপি নেতারা
ছবি : এশিয়া পোস্ট

কুমিল্লা নগরীর ধর্মসাগর পাড়ে ভাষাসৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সামনে স্থাপিত সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুমিল্লা মহানগর শাখার নেতারা। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাতে এ ঘটনা ঘটে।

সাইনবোর্ড ভেঙে দেওয়ার পর ঐতিহাসিক এই বাসভবনকে সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন দলটির নেতারা।

ভেঙে ফেলা সাইনবোর্ডটি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্তের পক্ষ থেকে স্থাপন করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইনবোর্ড ভাঙার একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিক বাড়িটি সংস্কার, সংরক্ষণ ও সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন বিভিন্ন মহলের মানুষ। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি বাড়িটির সামনে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন আরমা দত্ত। এতে জমিটির মালিকানা ওয়ারিশ সূত্রে তার বলে উল্লেখ করা হয়।

সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’

এনসিপির নেতাদের দাবি, বাড়িটি বিক্রির প্রচেষ্টা হিসেবে সেখানে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে এবং পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। ঐতিহাসিক বাড়িটি বিক্রি ঠেকাতে সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে জানান তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা কাজী আমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপির নেতাকর্মীরা বাড়িটির সামনে গিয়ে বক্তব্য দেন। এ সময় তাঁরা বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে সেটি সংরক্ষণের দাবি জানান। পরে বাড়ির সামনে স্থাপিত সাইনবোর্ডটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

রাতে এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়। এটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই বাড়িটিকে ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাড়িটি সংরক্ষণের দাবিতে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হবে।

রাত ১০টার দিকে মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, ‘আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাব। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণকে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।’

অন্যদিকে এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আরমা দত্ত। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানে। তাই এ বাড়িটির জায়গা আমি কী করব, রাখব না বিক্রি করব, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করব।’

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড কে ভেঙেছেন, সে বিষয়ে এখনও কেউ তাকে অবহিত করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লা শহরের নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তের মেয়ে আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।