এক চারায় শুরু, এখন ১৫০ জাতের আঙুরের বাগান ইকরামের

চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকেই জীবনের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ইকরাম খান। সে সিদ্ধান্তই আজ এনে দিয়েছে সাফল্য। একসময় সিঙ্গাপুরপ্রবাসী বড় ভাইয়ের দেওয়া একটি আঙুরের চারা ছিল তার সম্বল। সেই একটি চারার হাত ধরেই চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছোট হলদিয়া গ্রামে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৫০ জাতের আঙুরের বাগান। আঙুর ও চারা বিক্রি করে বছরে প্রায় ৯ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি।
২৬ বছর বয়সী ইকরাম খান ছোট হলদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি প্রকৌশলী সায়েদুল ইসলাম খানের ছেলে। চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় ইকরাম বর্তমানে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে মতলব দক্ষিণ উপজেলার কলাদী এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। সেখান থেকে প্রায় প্রতিদিন গ্রামে এসে নিজের বাগানের পরিচর্যা করেন।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের পাশে ১৮ শতক পৈতৃক জমিতে গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এই আঙুর বাগান। মালচিং পদ্ধতিতে তৈরি বাগানে সারি সারি গাছে ঝুলছে লাল, সবুজ, হলুদ ও পাকা-আধাপাকা আঙুরের থোকা। দূর থেকেই নজর কাড়ে সেই দৃশ্য।
ইকরাম জানান, ২০১৯ সালে এইচএসসি পাস করার পর আর পড়াশোনা এগোয়নি। চাকরির অপেক্ষায় না থেকে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২১ সালে সিঙ্গাপুরে থাকা বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়া থেকে একটি আঙুরের চারা পান। সেটি বাড়ির ছাদে লাগানোর এক বছর পর ফল আসে। থোকায় থোকায় আঙুর দেখে তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদেশ থেকে অনলাইন ও পরিচিতজনের মাধ্যমে ১৫০টি উন্নত জাতের আঙুরের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। পরে পৈতৃক ১৮ শতক জমিতে গড়ে তোলেন পূর্ণাঙ্গ আঙুর বাগান। বর্তমানে তার বাগানে ব্ল্যাক ম্যাজিক, গ্রিনলন, ভ্যালেজ, সুপারনোভা ও এঞ্জেলিকাসহ প্রায় ১৫০ জাতের আঙুরগাছ রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বাগানে আঙুর পাকা শুরু হয়। এখন পর্যন্ত তিনি সাড়ে ৬০০ কেজির বেশি পাকা ও আধাপাকা বিষমুক্ত আঙুর উৎপাদন করেছেন। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৩ লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি চারা বিক্রি করে আয় করেছেন আরও প্রায় ৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বছরে তার মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা।
ইকরাম খান বলেন, আমাদের এখানে মূলত মিষ্টি জাতের বিভিন্ন আঙুরের চারার চাহিদা বেশি। ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের চারা রয়েছে। এ পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি চারা বিক্রি করেছি।
তিনি বলেন, বাজারে নিয়ে যেতে হয় না। ফলগুলো মিষ্টি, রসালো ও বিষমুক্ত হওয়ায় মানুষ সরাসরি বাগানে এসে কিনে নিয়ে যায়। অনলাইনেও চারা ও ফলের ভালো চাহিদা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ইকরাম বলেন, আরও বড় পরিসরে আঙুর চাষ করতে চাই। দেশে আঙুরের উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমবে। আমি চাই, আরও তরুণ কৃষিতে আগ্রহী হোক।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. হালিম বলেন, পরিশ্রম আর ধৈর্য থাকলে সফলতা আসবেই, ইকরাম তার উদাহরণ। একটি চারা থেকে আজ সে বড় একটি আঙুর বাগান গড়ে তুলেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল মোহাম্মদ আলী বলেন, ইকরামের বাগান কয়েকবার পরিদর্শন করেছি। বিষমুক্ত ও সুস্বাদু আঙুর চাষ করে তিনি এলাকায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কৃষি অফিস থেকে তাকে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।