এবারও উত্তরের ঈদযাত্রায় ভোগান্তিতে ফেলতে পারে যমুনার টোলপ্লাজা

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের চার লেন চালু হওয়ায় এবার ঈদযাত্রায় ভোগান্তির শঙ্কা নেই সিরাজগঞ্জের ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে। পাশাপাশি যমুনা সেতু পশ্চিমপাড় মহাসড়কে নির্মিত সব উড়ালসেতুর ও হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জের সার্ভিস সড়কগুলো চালু রয়েছে। এতে বিগত সময়ে এই সড়কে তীব্র যানজট দেখা গেলেও এবার ঘরমুখী যাত্রীরা ভোগান্তিমুক্ত বাড়ি ফিরবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ঘরমুখো মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে যমুনা সেতু টোলপ্লাজা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে যমুনা সেতু হয়ে প্রতিদিন উত্তরের ১৬টি ও দক্ষিণের পাঁচটি জেলার প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার যানবাহন পারাপার হয়। ঈদ এলেই যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এতে বিপুলসংখ্যক গাড়ি একসঙ্গে সেতু পার হতে গিয়ে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। ফলে ভোগান্তির শিকার হন ঘরমুখী মানুষ। যমুনা সেতুতে একদিকে ছয় লেনের এবং অন্যদিকে চার লেনের গাড়ি টোল প্লাজা অতিক্রম করে সেতুতে প্রবেশ করলেও পাশাপাশি দুইটি যানবাহন একসঙ্গে যেতে না পারায় যানবাহনের চাপ সামলানো সম্ভব হয় না। এতেও সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন এবং লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে যানজট আরও বৃদ্ধি পায়। ঈদে সেতুর দুই পাড়ে দীর্ঘ যানজটের এটি অন্যতম কারণ।
এ বিষয়ে যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন দ্রুত রেসকিউ করার জন্য আগে দুটি রেসকিউ গাড়ি রাখা হয়েছিল। এবার এই সংখ্যাটি বাড়িয়ে আরেকটি রেসকিউ গাড়ি যুক্ত করা হয়েছে। আমরা যতটা পারি যমুনা সেতুতে সুন্দরভাবে যানবাহন পারাপারের বিষয়টি নিশ্চিত করব।
যমুনা সেতুর টোল প্লাজার তথ্যে জানা যায়, গত বছর রোজার ঈদের ছুটিতে ৪৮ হাজার ৩৬৮টি যানবাহন সেতু পারাপার হয়েছিল। আর কোরবানির ঈদের ছুটিতে ৬৬ হাজার ৪৮৯টি যানবাহন সেতু পারাপার হয়েছিল।
যমুনা সেতু সাইড অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায় সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে সাতটি করে বুথে টোল আদায় করা হয়। ঈদের ছুটি শুরু হলে বুথের সংখ্যা বাড়ানো হবে। প্রতি প্রান্তে নয়টি করে ১৮টি বুথে টোল আদায় করা হবে। মোটরসাইকেলের জন্য পৃথক বুথ থাকবে।
এদিকে এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সাড়ে ১৩ কিলোমিটার অংশ কয়েক বছর যাবত ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের গলার কাঁটায় পরিণত হয়ে আছে। গোড়াই থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ছয় লেন (সার্ভিস লেনসহ) মহাসড়ক চালু রয়েছে। তবে এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু অংশটি দুই লেন থেকে চার লেনের উন্নতিকরণের কাজ এখনো চলছে। ফলে ঢাকার দিক থেকে ছয় লেনে আসা পরিবহনগুলো দুই লেনে প্রবেশ করতেই গতি কমে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
এবার চন্দ্রা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত মহাসড়কের পুরোটাই চার লেন ব্যবহারের সুযোগ পাবেন যানবাহন চালকেরা। তারপরও যানজটের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মহাসড়ক চার লেন হলেও যমুনা সেতু দুই লেনের। ফলে সেখানে যানজট লেগে যেতে পারে। এছাড়া ঈদের ছুটি শুরু হলে প্রচুর ফিটনেসবিহীন যানবাহন দূর গন্তব্যে যাত্রা শুরু করে। সেতুর ওপর কিংবা সেতুর আগে এসব যানবাহন বিকল হয়ে সৃষ্টি হতে পারে যানজটের। কোনো কারণে সেতুর টোল আদায়ে ধীরগতি হলেও যানজট দেখা দিতে পারে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার বলেন, যেসব জায়গায় সমস্যা হতে পারে, ওই সব জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে।
হাটিকুমরুল হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আসন্ন ঈদুল ফিতরে উত্তরের ঈদযাত্রা হবে সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক। ঈদে একসঙ্গে সবার ছুটি এবং বাড়ি যাওয়ার কারণে সড়কে একটু চাপ থাকলেও কোনও যানজট থাকবে না। এ জন্য জেলা পুলিশ ও সড়ক বিভাগের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে ভোগান্তি মুক্ত রাখছে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে ১০০ জন পুলিশ সদস্য কাজ শুরু করেছে। ঈদযাত্রায় এর সংখ্যা আরও বাড়বে। এ ছাড়াও মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই যেন না হয় সেজন্যও বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সাসেক-২ প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের চার লেনের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে মহাসড়কের চারলেনই চালু রয়েছে। পাশাপাশি হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জের সার্ভিস সড়কগুলো দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ইন্টারচেঞ্জের ঢাকা থেকে বগুড়াগামী যে সড়ক রয়েছে সেটি এখন বন্ধ রয়েছে তবে ঈদযাত্রার আগে সেটি খুলে দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ইতোমধ্যে জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে দফায়-দফায় বৈঠক করেছি। মহাসড়কের পাশে ভ্রাম্যমাণ দোকান এবং সড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচলের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী প্রশাসন ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। ফলে এবার যানজট বা ভোগান্তি ছাড়াই স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছে ঘরমুখো মানুষ।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঈদযাত্রায় সিরাজগঞ্জের মহাসড়ক যানজটমুক্ত রাখতে ইতিমধ্যে আমরা কাজ শুরু করেছি। মহাসড়কের পাশে অবৈধ ভ্রাম্যমাণ দোকাগুলো উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়েছে। মহাসড়কে যেন ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়-ঝক্কর গাড়ি না চলে সেজন্য জেলা শ্রমিক নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করা হয়েছে। মহাসড়কের কোথাও যানবাহন দাঁড়াতে দেওয়া হবে না। আমাদের জেলা পুলিশে প্রায় ১ হাজার ৬০০ পুলিশ সদস্য রয়েছেন। ঈদ উপলক্ষে কেউ অসুস্থ না হলে সবাই মহাসড়ক ভোগান্তি মুক্ত রাখতে কাজ করবেন।
তিনি আরও বলেন, কোনও যানবাহন মহাসড়কে বিকল হলে দ্রুত সরিয়ে মহাসড়ক সচল করা হবে। এজন্য উদ্ধারকারী রেকার ও চেইন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে থাকবে। প্রস্তুত থাকবে উদ্ধারকারী টিমও। মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই যেন না হয় সে জন্যও বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং আমাদের ফোর্স কাজ শুরু করেছে। সবমিলে এ বছর উত্তরের ঈদযাত্রা হবে সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক।
এদিকে ঈদযাত্রায় সারা দেশে যানজটের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য ২০৭টি স্থান চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এর মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুরে সবচেয়ে বেশি যানজটের শঙ্কার কথা জানিয়ে হাইওয়ে পুলিশ বলছে, এই মহাসড়কে এমন ৫৫টি স্থান রয়েছে।