পাটওয়ারীর গাড়ি বিতর্কে আলোচিত সেই তুষার এখন মাদারীপুর এনসিপির আহ্বায়ক

মাদারীপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নতুন জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে আহ্বায়ক হয়েছেন এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়ি বিতর্কে দেশজুড়ে আলোচনায় আসা সেই মনিরুল ইসলাম তুষার ভূঁইয়া। একইসঙ্গে সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন রাজনীতিতে সমালোচিত মুখ ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহর যৌথ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে আগামী ৬ মাসের জন্য এই কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। নবগঠিত এই কমিটির মাধ্যমে তুষার ভূঁইয়ার নেতৃত্বেই মাদারীপুরে এনসিপির সব দলীয় কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
কমিটিতে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে আতিকুর রহমান হাওলাদারকে। এ ছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রয়েছেন মো. মনির হোসেন, রাজু আহমেদ, তুষার সব্যসাচী, বিপ্লব কাজী, হাসিবুল হাসান ও রেজাউল করিম। অন্যদিকে সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়েছে মো. ফরহাদ হোসেনকে এবং যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মহসিন ফকির, লায়ন আলমগীর হোসেন, শেখ মাসুদ, রুবেল মাহমুদ, মো. আবেদ আব্দুল্লাহ ও মো. হেলাল উদ্দিন।
যে ঘটনায় আলোচনায় ছিলেন তুষার
সম্প্রতি ১১ দলীয় জোটের লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ব্যবহৃত একটি অভিজাত গাড়ি নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর সূত্র ধরে দাবি করা হয়, ওই গাড়িটির প্রকৃত মালিক তুষার ভূঁইয়া।
ঘটনাটি ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের এক নেতার মালিকানাধীন ‘প্রাডো’ গাড়িতে চড়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সফর করেছেন। অন্যদিকে, আমজনতা পার্টির তারেক রহমানও দাবি তোলেন যে, গাড়িটির মালিক মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে তুষার ভূঁইয়া এবং তার সপক্ষে প্রমাণ হাজির করার কথাও জানান।
গাড়িটির মালিকানা সম্পর্কে জানতে চাইলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মন্তব্য করেছিলেন, ‘এই গাড়ির মালিকের কথা জানলে আপনারা গাড়ি ভেঙে ফেলবেন।’ তার এই মন্তব্যের পর গাড়িটির নম্বর ও মালিকানা নিয়ে ব্যাপক যাচাই-বাছাই শুরু হয়। তবে স্বতন্ত্র কোনো সূত্র থেকে গাড়িটির মালিকানার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে এনসিপির কমিটি ঘোষণার পর শীর্ষ এই দুই পদে দায়িত্ব দেওয়া নেতাদের নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। বলা হচ্ছে–শীর্ষ দুই নেতার অতীতে বিতর্কিত রাজনৈতিক অবস্থান ছিল। দলটির নেতৃত্বে আসার পেছনে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কতটা এবং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা কতটা কাজ করেছে–সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা যায়, মনিরুল ইসলাম এক সময় বিএনপির রাজনীতি করতেন। পরে ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগে (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ঠাঁই নেন। ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান দীর্ঘ সময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি এক সময় শিবচর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
প্রশ্ন উঠেছে–নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির মাদারীপুরে সংগঠন গুছিয়ে তুলতে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর কেন নির্ভর করা হলো। অতীতে বিতর্কিত রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভোল পাল্টানো ব্যক্তিকে কেন একটি জেলার শীর্ষ পদে দায়িত্ব দেওয়া হলো।
মনিরুল ইসলামের ভোল পাল্টানো
এনসিপির নতুন জেলা আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম তুষার ভূঁইয়ার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, মনিরুল ইসলাম এক সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে তিনি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
২০১১ সালে সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ছিলেন মনিরুল ইসলাম। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে থাকেন। তিনি স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
সূত্র বলছে, তিনি বাহাউদ্দিন নাসিমের ছোট ভাই মাদারীপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হয়ে ওঠা এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে এসব পরিচয় তাকে সুবিধাজনক পথ তৈরিতে সহায়তা করেছে।
মনিরুল ইসলামের এমন রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। তাকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—তিনি বিএনপির, আওয়ামী লীগের, নাকি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে অবস্থান বদল করা একজন নেতা।
ফোনে মনিরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা মূলত বিএনপি পরিবার। আমার বাবা নেতা ছিলেন। সেই সুবাদে আমরা বিএনপির সঙ্গে লেগে আছি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আমাদেরকে সেভাবে কোনো মূল্যায়ন করেনি। তাই নতুনদের দলে নতুনদের নিয়ে এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কাছ থেকে আমি কিছুই পাইনি। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।

ইয়াজ্জেম হোসেনের নতুন দলে ভেড়া
এনসিপির জেলা সদস্যসচিব হিসেবে ইয়াজ্জেম হোসেন রোমানকে নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে সমালোচনা চলছে। সূত্র জানায়, রোমান ছিলেন শিবচর উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকার পর তাকে জেলা কমিটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব দিয়েছে এনসিপি।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন–বিএনপির সাবেক নেতাকে এনসিপির জেলা নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে দলটি কী ধরনের যাচাই-বাছাই করেছে। তাদের অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে কী ধরনের সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
শিবচর উপজেলা বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোমান বিএনপিতে থাকা অবস্থায় নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। এ কারণে তিনি বিভিন্ন স্থানে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় তার এই অবস্থা। রোমান একজন সুবিধাবাদী লোক। যেখানে সুবিধা পাবেন, সেখানে তিনি প্রবেশ করার চেষ্টা করেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে ইয়াজ্জেম হোসেন রোমানের ফোনে একাধিকবার কল দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি কল রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘নতুন রাজনীতি’ বনাম পুরোনো মুখ
মাদারীপুরে এনিসিপির কমিটিতে পুরোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে ‘নতুন রাজনীতি’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একজন স্থানীয় রাজনীতিক নাম প্রকাশ না করে বলেন, কোনো ব্যক্তি আগে অন্য রাজনৈতিক দল করলে নতুন দলে আসতে পারবেন না—এমন কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু নতুন দল যখন পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের কথা বলে, তখন নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মনিরুল ইসলাম দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিলেন। তাকে এনসিপির জেলা আহ্বায়ক করা হয়েছে—এটা দেখে সবাই বিস্মিত।
তারা আরও জানান, মনিরুল ইসলাম একজন সুবিধাবাদী লোক। তিনি ক্ষমতাশালী দলের সুবিধা নেওয়ার জন্য দল পাল্টান। ত্রিমুখী সাপ—এদের কোনো দলে না নেওয়া ভালো।
সার্বিক বিষয়ে এনসিপির মাদারীপুর জেলা কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী মো. হাসিবুল্লাহি এশিয়া পোস্টকে বলেন, মনিরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা। তার আজীবন সংগ্রাম ছিল আওয়ামী লীগের জন্য। তিনি অভ্যুত্থানবিরোধী ছিলেন। জেলায় কীভাবে একজন আওয়ামী লীগের অনুসারীকে এনসিপির নেতা বানানো হলো–এটা জেনে আমরা বিস্মিত। দলের জন্য কাজ করলাম আমরা, নেতা হলো কে…।


