logo

‘নৌকাই চালু করতে পারছি না তেলের লাগি, তাই মাছ ধরা বাদ দিছি’

‘নৌকাই চালু করতে পারছি না তেলের লাগি, তাই মাছ ধরা বাদ দিছি’

‘আমরা জাইলে মানুষ। মাছ ধরলে পেটে ভাত যাব, না ধরলে ‍উফুস থাকতে হব। যমুনা নদীর এই পাশ থেকে ওই পাশে ঘুরি বেড়াই মাছের লাগি। কাছে মাছ পাওন যায় না, নৌকা নিয়ে যাওয়া লাগে দূরে। এহন এই নৌকার মেশিনই চালু করতে পারতাছি না তেলের লাগি। সন্যের (স্বর্ণ) চেয়ে এহন তেলের দাম বেশি হয়ে গেছে, তাই নৌকা ঘাটে বাইন্দা থুইয়া মাছ ধরা বাদ দিছি।’

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে কথাগুলো বলছিলেন জামালপুরের ইসলামপুরের জেলে ফরিদ শেখ। ইসলামপুরে যমুনা নদীর পাড়ে গুঠাইল ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধ নৌকার মধ্যে নিজের নৌকাটি বেঁধে চোখে ক্লান্তি, মুখে অনিশ্চয়তা, আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন ফরিদ শেখ। যাওয়ার পথে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলেন তিনি। 

ফরিদ শেখ বলেন, ‘তেলের কান্নে (জন্য) নৌকা চলতাছে না। অল্প তেল নিয়ে চরের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় আইটকি যাইগা, আর আসার মতো বুদ্ধি পাই না। পরে মাইনষের থেকে তেল হাওলাদ করে ঘাটে আসা লাগে। তেলের খুব সংকট। তেল ছাড়া কিছুই চলতেছে না।’

ফরিদ শেখের মতো বাকি জেলেদেরও একই দশা। জ্বালানি তেল না পেয়ে একমাত্র উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে আছে তাদের। এখন পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে নদীকেন্দ্রিক এই মানুষদের। 

যমুনা পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি নৌকা নদীর তীরে নোঙর করা। একসময় যেগুলো ছিল জীবিকার প্রতীক, সেগুলো আজ যেন নিরুপায় দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের খোলস। পর্যাপ্ত তেল না থাকায় নেই মাছ ধরার ব্যস্ততা, নেই পণ্য পরিবহনের কোলাহল। আয় নেই, চারদিকে শুধু স্থবিরতা।

ঘাটটির পাশেই জেলেপল্লি। পল্লির বাসিন্দা জলধর নমশুদ্রের এখন একটাই চিন্তা, তিন সন্তান ও স্ত্রী নিয়ে কীভাবে চলবে তার সংসার। তেলের সন্ধানেই এখন দিন যাচ্ছে তার। মাছ মারতে যাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে তার জন্য। বেকার হয়ে বসে থাকা এই জেলে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তেলই পাইতাছি না। আবার যদিও পাই, ১৮০ টাকা দিয়া এক লিটার তেল কেনা লোগে, সেই তেল দিয়ে যাইতে যাইতেই শেষ, তাইলে ফিরমু কেমনে? আবার অনেক সময় মাছও উঠে না। দেখা যায় এক-দেড়শ টাকার মাছ পাই এখন। এই মাছ দিয়া কি করমু- বাড়িতে নিবো, না বাজারে বেচমু।’ 

একটু থেমে আবার বলেন, ‘১৮০ টাকা খরচ কইরা তেল কিনি, আর মাছ পাই ১৫০ টাকার। এইডা দিয়া কি সংসার চলে? আমার তিনডা মাইয়া, তাদের পড়ালেখা, খাওয়া-দাওয়া কেমনে চালামু, বিয়া দিমু কেমনে?’

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ঢেউ এসে সরাসরি আছড়ে পড়েছে এই প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলোর ওপর। জ্বালানি তেলের অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব সড়কপথের পাশাপাশি নৌপথেও পড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এ অঞ্চলের নদীনির্ভর জেলে, মাঝি আর চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ।

তেল সংকটে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না জেলেরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাঁচ দিন ধরে নদীতে যেতে পারেননি জেলে শুভল। তিনি বলেন, ‘তেল ছাড়া তো আমাগো কিছুই নাই। মাঝ নদীতে না গেলে মাছ নাই। আবার তেল ছাড়া গেলে মাঝপথে আটকা পড়ি। এখন তেল স্বর্ণের চেয়েও দামি হইয়া গেছে। সরকার যদি আমাদের একটু সাহায্য করত, তাহলে আমরা বাঁচতে পারি।’

নিতাই নমশূদ্রের কণ্ঠেও একই হাহাকার। তিনি বলেন, আগে ১০১ টাকায় তেল পাইতাম, এখন ২০০ টাকাতেও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। ছোট নৌকা দিয়া মাঝ নদীতে যাওয়া যায় না। আমরা কেমনে চলমু? অন্য কোনো কাজও তো নাই। ছোট থেকে মাছ ধরি খাই, এখন অন্য কী কাজ করব চিন্তায় আছি।

জেলে কাজল দাশ একটু আশার সুরে বলেন, গতকাল কিছু তেল পাইছি, আগের থেকে দাম বেশি। ১০১ টাকায় এখন আর তেল পাওয়া যাইতেছে না। যারাও আনে, তারা গাইবান্ধা-বগুড়া থেকে আইনা আমাদের কাছে বিক্রি করে। বেশি দামেই কিনে আজকে যামু মাছ ধরতে। এখন দেখি কি হয়। মাছ যদি পাই, তাইলে কিছুটা খরচ উঠবে। কারো কাছে হাত পাতলেও কেউ দেয় না আমাদের। নদীতে আমাদের যাইতে হবোই। যদি আমরা ন্যায্য দামে তেলটা পাইতাম, তাহলে আমরা বাঁচতে পারতাম। সরকারের উচিত আমাদের জন্য কিছু করার।’

যমুনার পাড়ে অলস পড়ে আছে জেলেদের নৌকা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জেলা প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং বাজার মনিটরিং চলছে। 

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম আব্দুল্লাহ-বিন-রশিদ বলেন, জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মাঝিদের নৌ চলাচল সচল রাখতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।

জামালপুরে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২২ হাজার ২৯ জন। আর দৈনিক এ জেলায় মাছের চাহিদা ৪২ হাজার টন। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকা আজ অনিশ্চয়তার মুখে।