পরিবেশ রক্ষার নীরব সৈনিক

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লড়াইয়ে একজন নীরব সৈনিক মাহবুবুল ইসলাম পলাশ। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে দেশের ৬৪ জেলায় তিনি এই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। গড়ে তুলেছেন ‘পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালা, সিরাজগঞ্জ’ নামের পরিবেশবাদী পাঠশালা। এই সংগঠনটি পরিবেশ আন্দোলনে ব্যতিক্রমী ও অনুকরণীয় উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
পলাশ ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশের ৬৪ জেলায় বিনামূল্যে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির প্রতীকী ‘বৈলাম’ বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন। এই কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয় দেশের উত্তরের সর্বশেষ জনপদ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে এবং শেষ হয় দক্ষিণের প্রান্ত টেকনাফে। এটি দেশের ভৌগোলিক বিস্তৃতির সঙ্গে পরিবেশ আন্দোলনের একটি শক্ত প্রতীকী বার্তা বহন করছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও পলিথিনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তিনি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাট-বাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা ও মন্দিরসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তিনি নিজ উদ্যোগে পাটের ব্যাগ উপহার দিয়ে মানুষকে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহিত করছেন।
গত ২৬ বছরে তিনি সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৮০০টিরও বেশি পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ বিতরণ ও রোপণ করেছেন। পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজে বিরল প্রজাতির বৃক্ষের বাগান স্থাপন করেছেন। জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে অন্তত ৩ লাখ মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
তার প্রতিষ্ঠিত পরিবেশ পাঠশালায় বর্তমানে বিপন্ন ও বিরল ৩৪৫ প্রজাতির পাঁচ হাজারেও বেশি গাছ সংরক্ষিত আছে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এখানে সুন্দরবনের ২০ প্রজাতির গাছপালা সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাখিদের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে রয়েছে অসংখ্য ফলদ বৃক্ষ ও একটি বিশেষ পুকুর; যেখানে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পুকুরের মাছ শুধু দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালা, সিরাজগঞ্জ-এর উদ্যোগে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবসে নিয়মিতভাবে বৃক্ষ, লিফলেট ও সচেতনতামূলক উপকরণ বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত বাগানে গড়ে তোলা পাখির অভয়ারণ্য স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বৃহৎ পরিসরের সব কার্যক্রমের ব্যয় তিনি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগ ও নিজ অর্থায়নে বহন করে আসছেন; যা পরিবেশ আন্দোলনে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মাহবুবুল ইসলাম পলাশ দুইবার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন—একবার কৃষি খাতে এবং একবার বৃক্ষরোপণে (সমগ্র বাংলাদেশে দ্বিতীয় স্থান)। এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পুরস্কারসহ শতাধিক সম্মাননা পেয়েছেন।
মাহবুবুল ইসলাম পলাশ বলেন, পরিবেশ রক্ষা এক দিনের কর্মসূচি নয়। এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা যদি প্রকৃতিকে রক্ষা না করি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যেতে পারব না।