logo
Advertisement

মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের পরও ক্লাসরুমের বাইরে প্রভাষক ছাইদুল

এশিয়া পোস্ট নিউজ,ময়মনসিংহ
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের পরও ক্লাসরুমের বাইরে প্রভাষক ছাইদুল
তারাকান্দা সরকারি ডিগ্রি কলেজ ও শিক্ষক ছাইদুল হক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আদালত তাকে খালাস দিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পুনর্নিয়োগের প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। তবু শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি প্রায় ২৪ বছরের শিক্ষকতা করা ময়মনসিংহের তারাকান্দা সরকারি ডিগ্রি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মো. ছাইদুল হকের। সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক স্বীকৃতি থাকার পরও নিজের চেনা কর্মস্থলে শিক্ষক হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন না তিনি।

Advertisement

মামলা ও খালাস

মামলার নথি ঘেঁটে জানা গেছে, ইকরাম হোসেন খান নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ধার নেন ছাইদুল হক। পরে ২০১৫ সালের ৭ মে ছাইদুল হক তার নিজ অ্যাকাউন্ট থেকে ইকরামকে ১০ লাখ টাকার একটি চেক প্রদান করেন। কিন্তু চেকটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা দিলে ছাইদুল হকের হিসাব নম্বরে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চেকটি ওই বছরের ১৯ অক্টোবর ডিজঅনার হয়। পরে ছাইদুল হককে লিগ্যাল নোটিশ দেন ইকরাম। টাকা পরিশোধ না করায় পরবর্তীতে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ছাইদুলের নামে মামলা হয়। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর ছাইদুলকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন আদালত। পরে ২০২০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ৫০ শতাংশ টাকা চালানমূলে জমা করে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপীল করেন ছাইদুল হক। পরে দুই পক্ষের আপোস-মীমাংসা হয়েছে মর্মে আদালতে আপোষনামা দাখিল করা হয়। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আদালত আপোস মঞ্জুর করে ছাইদুলের রায় ও অর্থদণ্ড রহিত করেন। ছাইদুল হক অভিযোগ দায় থেকে খালাস পান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পুনর্নিয়োগের প্রজ্ঞাপন

ছাইদুল হকের এমপিও হয় ২০০২ সালে এবং এটি চালু থাকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বেতন বন্ধ হয়ে যায়। মন্ত্রণালয়ের শর্ত ছিল এডহক নিয়োগ পেতে গেলে মামলা থেকে খালাস পেতে হবে। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে কলেজে অধ্যক্ষ না থাকায় গত বছরের ২৭ জুলাই কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মোস্তফা মো. জাকারিয়া সরকারের বরাবর এডহক নিয়োগের জন্য আবেদন করেন ছাইদুল হক। মো. জাকারিয়া আবেদন গ্রহণ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) পাঠান। প্রায় এক বছরের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পর চলতি বছরের ১৬ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-৫ শাখা থেকে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে তার পুনর্নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী তাকে রাজস্ব খাতে নিয়োগ দেওয়া হলো।

পুনর্নিয়োগের সরকারি আদেশ জারি হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত ছাইদুল হক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু করতে পারেননি। নিয়মিত কলেজে গেলেও ক্লাস রুটিনে তার নাম যুক্ত হয়নি।

কী বলছেন কলেজের শিক্ষকরা

কলেজের আইসিটি বিভাগের শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান খান বলেন, দীর্ঘদিনের আর্থিক ও মানসিক কষ্টের পর তিনি পুনর্নিয়োগ পেয়েছেন। এখন ক্লাস নিতে না পারাটা সত্যিই হতাশাজনক। প্রশাসনিক নথিতে এটি হয়ত একটি চাকরি-সংক্রান্ত বিষয়। কিন্তু বাস্তবে এটি একজন মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ, চিকিৎসা খরচ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ- সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

শিক্ষাবিদ লে.কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, কোনো শিক্ষককে পুনর্নিয়োগের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জারি হলে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। সে ক্ষেত্রে বিলম্বের যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।

শিক্ষক ছাইদুল হক বলেন, আমার হাতে এখন পুনর্নিয়োগের সরকারি প্রজ্ঞাপন আছে। আদালতের খালাসের আদেশও আছে। নেই শুধু শ্রেণিকক্ষে ফিরে দাঁড়ানোর সুযোগ। দুই বছর পাঁচ মাসের বেতনহীন জীবন, অসুস্থতা, আইনি লড়াই আর প্রশাসনিক অপেক্ষার পরও আমার সামনে এখনও একটি প্রশ্ন ঝুলে আছে- শ্রেণিকক্ষের দরজা খুলতে আর কত সময় লাগবে?

তিনি বলেন, একসময় ক্লাসরুম ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে পরিচিত জায়গা। এখন সেখানে যেতে পারলেও শিক্ষক হিসেবে দাঁড়াতে পারছি না। এটা শুধু চাকরি হারানোর কষ্ট নয়, নিজের অস্তিত্ব হারানোর মতো অনুভূতি।

অধ্যক্ষ ও সংসদ সদস্যের বক্তব্য

তারাকান্দা সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আফাজ উদ্দিন বলেন, পুনর্নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র পেয়েছি এবং সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে খুব শিগগিরই ছাইদুল হক শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারবেন। তবে কেন এখনও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ বলেন, আমি বর্তমানে সংসদে আছি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। খোঁজ নিয়ে পরে মন্তব্য করব।