অনুমোদন ছাড়াই কক্সবাজারে চলছে আড়াই শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের ৮০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশসহ পর্যটন নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নকশাগত ত্রুটি, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই অবৈধভাবে চলছে আড়াই শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁসহ পর্যটনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান। পর্যাপ্ত তদারকি না থাকা এবং প্রশাসনিক জটিলতার সুযোগে নোটিশ ও জরিমানা সত্ত্বেও অব্যাহত রয়েছে এসব ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম।
সাগরঘেঁষা নিরিবিলি পরিবেশের কারণে এসব স্থাপনার প্রতি পর্যটকদের আকর্ষণও বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ইকো’ শব্দটি, যার অর্থ পরিবেশবান্ধব। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশের নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদিত নকশা কিংবা ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স। নেই অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
সম্প্রতি উখিয়ার পাটুয়ারটেকের ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু ও ৬ জন আহত হওয়ার পর পর্যটনকেন্দ্রিক স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মেরিন ড্রাইভের আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠান যাচাই করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বৈধ কাগজপত্রের ঘাটতি পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিয়ে সতর্ক করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অনুমোদনহীনভাবেই চলছে হোটেল-রিসোর্টসহ বিভিন্ন পর্যটন স্থাপনা।
এরই মধ্যে গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় ছিল এই টুপটুপ রিসোর্টও। অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অপরদিকে এই ঘটনার পর সামনে আসছে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কীভাবে চলছে এসব ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান।
নোটিশ ও জরিমানার পরও চলছে রিসোর্ট ব্যবসা
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সময়ে মেরিন ড্রাইভের ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নোটিশ অমান্য করায় ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানা করা হয়েছে। দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা এশিয়া পোস্টকে বলেন, মেরিন ড্রাইভের টুপটুপ রিসোর্টসহ আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
টুপটুপ রিসোর্টের বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবেশগত ছাড়পত্র না নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করায় এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যক্রম বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশ অমান্য করায় পরের মাসের ১৩ তারিখে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে কউকের অনুমোদিত ভবনের নকশা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকতে হয়। টুপটুপ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের এসব প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ছিল। অপরদিকে কউকের তথ্য অনুযায়ী, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা আড়াইশ এর বেশি।
কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, টুপটুপ রিসোর্টের কউকের অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, তবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সব প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ধারাবাহিকভাবে যাচাইয়ের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে যাচাই করা আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় বৈধতা নিশ্চিত করতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হবে। এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
জরিমানা দিয়েও চলছে যেসব রিসোর্ট
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৯ সালে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। এসব এলাকায় টুপটুপসহ বিভিন্ন রিসোর্ট নির্মিত হয়। পরিবেশ আইনে নিয়মভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ ও জরিমানা করা গেলেও স্থাপনা উচ্ছেদ বা বন্ধ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনি এক্তিয়ার গুরুত্বপূর্ণ। কউকের এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার এক্তিয়ার রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জরিমানা করা ১৪টি রিসোর্টের মধ্যে রয়েছে রামুর মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন সাম্পান বিচ রিসোর্ট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, নিসর্গ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট ৪ লাখ টাকা, উখিয়ার সি পার্লস বিচ রিসোর্ট ১ লাখ টাকা, টেকনাফের জাহাজপুরা ক্যাসল ১ লাখ ১ হাজার টাকা, উখিয়ার সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা ৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, কলাতলীর জিডি সমুদ্র বিলাস ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মায়াবী বিচ রিসোর্ট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং টাইটান হোটেল ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ ছাড়া কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার হোটেল জানা ডাডাকে দুই লাখ টাকা এবং হোটেল স্যুট সাদাফকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।
অপরদিকে, নোটিশ পাওয়া হোটেল ও রিসোর্টের মধ্যে রয়েছে হিমছড়ির বে হিলকে, বে ফ্রেন্ডস রিসোর্ট, সাম্পান রিসোর্ট, মারমেইড ক্যাফে, আরনিম রিসোর্ট, ছুটি রিসোর্ট, হোটেল ইনানী লং বে এবং ওশান পার্ল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। এর বাইরে নামহীন তিনটি নির্মাণাধীন হোটেলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
জেলা শহরেও অনুমোদনহীন হোটেল-রিসোর্ট
এদিকে শুধু মেরিন ড্রাইভ নয়। কক্সবাজার জেলা শহর, রামুর পেঁচারদ্বীপ ও উখিয়ার ইনানীসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায়ও অনুমোদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচশ হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে।
জানতে চাইলে কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম এশিয়া পোস্টকে বলেন, সমিতির তালিকাভুক্ত হোটেলগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে। তবে কক্সবাজারের অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতি মানে না বলে সমিতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রশাসনের উচিত, এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়মের আওতায় এনে পর্যটনশিল্পের বিকাশ নিশ্চিত করা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার কক্সবাজার ইনস্পেক্টর শফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, চলতি বছরে আবেদন জমা পড়েছে সর্বোচ্চ ১০০টি। এর মধ্যে মাত্র ৫০টি হোটেল তাদের লাইসেন্স নবায়ন করেছে। অথচ এর আগে প্রায় ২০০টি হোটেলের লাইসেন্স ছিল। এ কারণে অধিকাংশ হোটেলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনিম জাহান এশিয়া পোস্টকে বলেন, পর্যটনকেন্দ্রিক অনেক স্থাপনায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয় না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই, আবার অনেকে লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও নিয়ম মানেন না। কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই দ্রুত স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জনবলের অভাবে সব ক্ষেত্রে যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে জেলা প্রশাসন ও কউকের সমন্বয়ে রিসোর্টগুলো দ্রুত যাচাই করা হবে। অনিয়ম পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দায় এড়াতে পারে না সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির পর একের পর এক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত হওয়ার তথ্য সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকেরা।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব বেলাল আবেদীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, পর্যটন শিল্পের বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। টুপটুপ রিসোর্টসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকার দায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এড়াতে পারে না। নোটিশ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জানতে চাইলে কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা এশিয়া পোস্টকে বলেন, চোখের সামনে ভবন হচ্ছে, ব্যবসা করছে। এটা ব্যবসায়ীর চাইতে প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা চোখে পড়ে। প্রতিটি স্থাপনা নির্মাণে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। অথচ, মানুষ রাতারাতি ভবন নির্মাণ করছে। এটি পর্যটনের জন্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শুধু নোটিশ দিয়ে দায় এড়াতে পারে না। এটা প্রশাসনিক ব্যর্থতা।


