দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে বন্দি চা শ্রমিকের জীবন

দুটি পাতার একটি কুঁড়ি–ছোট্ট বাক্যটির মধ্যে লুকিয়ে আছে চা-শিল্পের গল্প। ভোর থেকে সন্ধ্যা, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পাতা সংগ্রহ করেন চা-শ্রমিকরা। তাদের শ্রমে উৎপাদিত চা থেকে ঘ্রাণ ছড়ায় দেশ-বিদেশের মানুষের কাপে। যে মানুষগুলোর ঘাম-শ্রমে টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প, তাদের জীবন রয়ে গেছে বঞ্চনা ও দারিদ্র্যের চক্রে বন্দি।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) আন্তর্জাতিক চা দিবস। বিশ্বজুড়ে যখন চা শিল্পের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা নিয়ে নানা আয়োজন হচ্ছে, তখন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির চা-শ্রমিকদের বাস্তবতা বলছে এক ভিন্ন গল্প। যুগের পর যুগ ধরে তারা কাজ করে গেলেও বদলায়নি জীবনমান। নেই পর্যাপ্ত মজুরি, নেই উন্নত চিকিৎসা ও শিক্ষা সুবিধা, নেই নিরাপদ বাসস্থান কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা।
১৮ শতকে উপমহাদেশে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয় চট্টগ্রামে। শতাধিক বছর পেরিয়ে পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলেছে, আধুনিক হয়েছে জীবনযাত্রা। ফটিকছড়ির চা-শ্রমিকদের জীবন যেন এখনও সেই পুরোনো সময়ে আটকে আছে। মূল্যস্ফীতির এই সময়ে দৈনিক মাত্র ১৭৮ টাকা মজুরিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন উপজেলার ১৮টি চা বাগানের প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক।
আন্তর্জাতিক চা দিবস উপলক্ষে ফটিকছড়ির নারায়ণহাট ইউনিয়নের নেপচুন চা বাগানে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে। তাদের একজন তাহেরা বেগম। ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করে ১৭৮ টাকা পাই। কাজ না করলে মজুরিও নেই। এখন এই টাকায় দুই কেজি চালও হয় না। সংসার চালাব কীভাবে?
একই অভিযোগ টিকে গ্রুপের মালিকানাধীন রাঙাপানি চা বাগানের শ্রমিক নিরঞ্জন ত্রিপুরার। তিনি বলেন, অনেক পরিবারে পাঁচ-ছয়জন সদস্য, অথচ আয় করে একজন। সেই ১৭৮ টাকার ওপরই পুরো পরিবার চলে। ভাঙাচোরা ঘরে সন্তান আর গবাদিপশু নিয়ে থাকতে হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ ঘর মেরামতের কথা বললেও বছরের পর বছর কিছুই করে না।
চা-শ্রমিক ও পঞ্চায়েত নেতাদের অভিযোগ, অধিকাংশ বাগানে শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয় না। শ্রম আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির শর্তও অনেক ক্ষেত্রে মানা হয় না।
শ্রমিকরা জানান, বংশপরম্পরায় তারা এই পেশার সঙ্গে জড়িত। তাদের শ্রম-ঘামে চা শিল্পের উন্নয়ন হলেও নিজেদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানি ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদাগুলোও আজ তাদের কাছে অধরাই রয়ে গেছে। জরাজীর্ণ পরিবেশে বসবাস করায় নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন নারী ও শিশুরা।
উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মালিকানাধীন কৈয়াছড়া চা বাগানের শ্রমিক লক্ষ্মীধন ত্রিপুরা বলেন, আমরা যারা বাগানের বাইরে পরিবার নিয়ে থাকি, তারা আরও বেশি বঞ্চনার শিকার হই। অল্প টাকায় কোনোমতে সংসার চালাতে হয়।
সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন কর্ণফুলী চা বাগানের শ্রমিক কৃষ্ণ মনি জানান, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত টানা কাজ করতে হয়। দুপুরে ঠিকমতো খাওয়ার সময়ও মেলে না। অথচ এত পরিশ্রমের পরও হাতে আসে মাত্র ১৭৮ টাকা।
অঞ্জনি ত্রিপুরা বলেন, এত কম বেতনে পরিবার চালানো খুব কষ্ট। সামনে ঝড়-বাদলের দিন। বাগান থেকে একটা রেইনকোটও দেয়নি। শুধু একটা প্লাস্টিক দেয়, তাতেও শরীর ভিজে যায়।
পঞ্চায়েত নেতা মৃদুল কর্মকার বলেন, চা-শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে এই শিল্পের প্রসার হলেও তাদের জীবন থেকে বঞ্চনা দূর হয়নি। প্রতি বছর নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে জীবনমানের উন্নয়ন হয় না।



