logo

মানিকগঞ্জ/‘বাবা-মায়ের শেষ স্মৃতিটুকুও কেড়ে নিল নদী’

‘বাবা-মায়ের শেষ স্মৃতিটুকুও কেড়ে নিল নদী’
মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে তীব্র নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে লাউতারা গ্রামের নদীতীরবর্তী এলাকা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে কবরস্থানে এসেছিলেন মো. আমিন উদ্দিন মোল্লা। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, দিনকয়েক আগেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে তাদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন।

প্রায় ১০ বছর আগে বাবা-মাকে হারিয়েছেন আমিন উদ্দিন। এতদিন নিয়মিত কবরস্থানে এসে তাদের কবর জিয়ারত ও দোয়া করতেন। এখন সেই কবরস্থানটির বড় একটি অংশই নদীর পেটে। আমিন উদ্দিন বলেন, বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে পারব না, এটা অত্যন্ত কষ্টের। নদী যে এভাবে শেষ স্মৃতিটুকুও কেড়ে নেবে, তা কখনো ভাবিনি।

শুধু আমিন উদ্দিনের বাবা-মায়ের কবরই নয়, নদীভাঙনে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার লাউতারা গ্রামের সার্বজনীন এই কবরস্থানের অসংখ্য কবর বিলীন হয়ে গেছে। এলাকার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের একমাত্র এই কবরস্থানটি গড়ে উঠেছিল ৪০ শতাংশ জমির ওপর। যার প্রায় অর্ধেকই ইতোমধ্যে যমুনা/ধলেশ্বরীর গ্রাসে বিলীন। অবশিষ্ট অংশও চরম ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে স্বজনদের দাফনের একমাত্র জায়গাটিও হারিয়ে যাবে।

নদীভাঙনের থাবায় শুধু কবরস্থানই নয়, লাউতারা এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প, শত শত বসতভিটা ও ফসলি জমিও নদীতে বিলীন হয়েছে। বিঘার পর বিঘা জমি হারিয়ে অনেক পরিবার এখন দিনমজুর বা বর্গা চাষী। স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম এ পর্যন্ত পাঁচবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। তিনি জানান, নিজের দুই বিঘা জমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে নদীগর্ভে। এখন অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।

এদিকে নদীভাঙনের তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থাও। ঐতিহ্যবাহী ‘আমতলী ফেদু শেখ উচ্চ বিদ্যালয়টি’ নদীর একদম কাছাকাছি চলে এসেছে। প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থীর এই বিদ্যাপিঠটি ভেঙে গেলে আশপাশে আর কোনো স্কুল না থাকায় পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে অনেকের। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেঘলা বলে, আমার বাবা কৃষক। ঘরের কাছে স্কুল বলেই পড়তে পারছি। স্কুলটা ভেঙে গেলে দূরে গিয়ে পড়ালেখা চালানো বাবার পক্ষে সম্ভব হবে না।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক নিরাঞ্জন কুমার সরকার দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, স্কুলটি রক্ষা করা না গেলে এই চরাঞ্চলের শতাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন অনিশ্চয়তায় পড়বে।

স্কুলের পাশেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘আমতলী হাট’। দৌলতপুরের অন্যতম বড় এই হাটের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন কয়েকশো স্থানীয় ব্যবসায়ী। স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আশরাফ জানান, হাটটি নদীতে বিলীন হলে শুধু একটি বাজারই হারাবে না, শত শত পরিবারের আয়ের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মাদ আক্তারুজ্জামান জানান, ভাঙনকবলিত এলাকাটি নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে জরিপকাজ সম্পন্ন করে দ্রুত স্থায়ী জিওব্যাগ বা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।