logo
Advertisement

নিউইয়র্কে গুলিতে নিহত রাজু, ৪৩ লাখ টাকার ঋণে দিশেহারা পরিবার

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নোয়াখালী
নিউইয়র্কে গুলিতে নিহত রাজু, ৪৩ লাখ টাকার ঋণে দিশেহারা পরিবার
নিহত রাজুর গ্রামের বাড়িতে আসছেন স্বজনরা। সোমবার নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কংশনগর গ্রামে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

দাদা-দাদি ও বাপের সম্পত্তি বিক্রি করে এবং প্রায় ৪৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর মো. ইউসুফ রাজু। স্ত্রীকে অন্তঃসত্ত্বা রেখে রঙিন ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় যাওয়া সেই যুবকের স্বপ্ন এখন মুখোশধারী দুর্বৃত্তের গুলিতে মাটিচাপা পড়েছে।

Advertisement

স্বামীর মৃত্যুতে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা স্ত্রী। ঋণের বোঝায় টিনের পুরোনো ভাঙা ঘরটিও জীর্ণশীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বপ্ন ছিল আগামী বছর দেশে এসে কাগজপত্রের কাজ শেষ করে স্ত্রী-সন্তানদেরও নিয়ে যাবেন নিজের কাছে।

গত শনিবার স্থানীয় সময় পৌনে ১২টার দিকে নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনের ইস্ট নিউইয়র্ক এলাকার ৮৪২ রকওয়ে অ্যাভিনিউয়ের ‘আমেরিকান বেস্ট উইং রেস্টুরেন্টে’ কাজ করার সময় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন রাজু।

রাজুর বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কংশনগর গ্রামে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্ত্রী, দুই সন্তান, বাবা-মা ও ভাই-বোনের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

আমিশাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল আজিজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য রাজুর প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ঋণ হয়েছিল। এর মধ্যে নিজের জমানো ১২ লাখ টাকাও খরচ করেছিলেন তিনি। ঋণের বড় একটি অংশ এখনো পরিশোধ হয়নি। পরিবারের জরাজীর্ণ ঘরটিও মেরামত করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, রাজু একসময় রঙের কাজ করতেন। পরে প্রায় তিন বছর কাতারে ছিলেন। এরপর ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরিবারের সচ্ছলতার জন্য অনেক ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। তার এমন মৃত্যুতে পরিবারটি কীভাবে চলবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

রাজুর দুই মেয়ে—১২ বছর বয়সি জান্নাতুল নাঈমা ও আড়াই বছর বয়সি রাইসা। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় স্ত্রী পলি আক্তার সন্তানসম্ভবা ছিলেন। রাজু বিদেশে যাওয়ার পরই জন্ম নেয় ছোট মেয়ে রাইসা। মেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়েই বিদেশে দিন-রাত পরিশ্রম করছিলেন তিনি।

স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে এখন দিশেহারা পলি আক্তার। তিনি স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

রাজুর বাবা মোহাম্মদ উল্লা ও মা লাকি আক্তারও ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় রাজুর সহকর্মী মো. রাসেলও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তার বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার বিপুলাসার ইউনিয়নের বড়কাছি গ্রামে। তিনি ব্রুকডেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক রুদ্র মাসুদ জানান, শনিবার রাতে রাজু ও রাসেল রেস্টুরেন্টে কাজ করছিলেন। এ সময় এক দুর্বৃত্ত অতর্কিতে রেস্টুরেন্টে ঢুকে গুলি চালায়। প্রথমে রাসেলের পায়ে গুলি লাগে। পরে রাজুকে গুলি করে পালিয়ে যায় ওই দুর্বৃত্ত।

খবর পেয়ে এনওয়াইপিডির সেভেন্টি থার্ড প্রিসিংকটের পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনকে উদ্ধার করে ব্রুকডেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন। রাসেল বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

রাজুর কয়েকজন সহকর্মী জানান, নিউইয়র্কের কুইন্সের ওজন পার্ক এলাকায় একটি ব্যাচেলর বাসায় থাকতেন তিনি। অবসর পেলেই স্ত্রী ও মেয়েদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর বৈধ কাগজপত্র নিয়েই কাজ করছিলেন রাজু।

রাজুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও একই গ্রামের রেস্টুরেন্ট মালিক আবদুল জলিল শিপন জানান, খবর পেয়ে তিনি রেস্টুরেন্ট ও পরে হাসপাতালে ছুটে যান। রাজু বা অন্য কোনো কর্মীর সঙ্গে কারও পূর্ববিরোধ ছিল বলে তার জানা নেই।

তিনি বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে। রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ ও রাজুর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন পুলিশ নিয়ে গেছে। তবে রোববার রাত পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে আটক করার খবর পাওয়া যায়নি।

‘দি গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটি-ইউএসএ ইনক’-এর সভাপতি জাহিদ মিন্টু জানান, নিহত রাজু সংগঠনটির সদস্য ছিলেন না। তবে তার মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে সংগঠনটি।

রাজুর বাবা মোহাম্মদ উল্লা বলেন, একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে পরিবার এখন ঋণের বোঝা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তার দুই শিশুকন্যার পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি ।