নিজের টাকায় গড়া আলিশান বাড়িতে ঠাঁই নেই প্রবাসীর

যে সংসারে একসময় অভাব-অনটন ছিল, আট ভাইবোন ও বাবা-মাকে নিয়ে চলত টানাটানি, সেই সংসারের ভাগ্য বদলাতে জীবনের ১৭টি বছর প্রবাসে কাটিয়েছেন মোসারেফ হোসেন। পরিবারের সচ্ছলতার জন্য নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে পাঠিয়েছেন বিপুল অর্থ। সেই টাকায় কেনা হয়েছে জমি, গড়ে উঠেছে আলিশান বাড়ি। অথচ আজ সেই বাড়িতেই ঠাঁই হচ্ছে না তার। উপার্জিত অর্থ ও সম্পদের হিসাব চাওয়াকে কেন্দ্র করে পরিবারের সঙ্গে তৈরি হয়েছে বিরোধ। এমনকি ১৬ লাখ টাকার একটি মামলায় কারাভোগের অভিযোগও করেছেন এই প্রবাসী।
ভোলার লালমোহন উপজেলার চরভূতা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বশিরউল্লা মুন্সি বাড়ির বাসিন্দা মোসারেফ হোসেন জীবিকার সন্ধানে প্রথমে ওমানে কাটান প্রায় ৯ বছর। এরপর কুয়েতে আরও ৮ বছর শ্রম দেন। প্রবাসের কঠিন জীবনে উপার্জিত অর্থ তিনি নিয়মিত দেশে পাঠান। মোসারেফের দাবি, দীর্ঘ ১৭ বছরে বাবা বশির উল্লাহ মুন্সি, মা মনোয়ারা বেগম ও ছোট বোন সাবরিনা আক্তার সেলিনার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬ কোটি টাকা পাঠিয়েছেন তিনি।
তার অভিযোগ, সেই অর্থে কেনা হয়েছে জমি, নির্মিত হয়েছে পাকা আলিশান বাড়ি এবং কেনা হয়েছে সোনার গয়নাসহ বিভিন্ন সম্পদ। কিন্তু যে পরিবারের সচ্ছলতার জন্য জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করেছেন, আজ সেই পরিবারের সঙ্গেই তার বিরোধ তৈরি হয়েছে।
প্রবাসী মোসারেফ হোসেন বলেন, আমি একজন কুয়েতপ্রবাসী। ১৭ বছর ধরে না খেয়ে, না ঘুমিয়ে পরিশ্রম করেছি—একটাই আশায়, এক দিন দেশে ফিরে বাবা-মাকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করব। বাবা-মা ও দুই বোনের কাছে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা পাঠিয়েছি। নিজের উপার্জনের টাকায় এই আলিশান বাড়িটি বানিয়েছি। অথচ আজ বাবা-মা ও দুই বোন মিলে আমাকে নিজের বাড়িতেই ঢুকতে দিচ্ছেন না।
তিনি আরও জানান, দেশে ফিরে বাবার পছন্দে বিয়ে করার পর থেকেই বিরোধের সূত্রপাত। বাড়িতে প্রবেশ করতে গেলে আরও টাকা দাবি করা হয় এবং মারধর করা হয় বলে অভিযোগ তার। এমনকি তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে বাড়িতে আসার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাবা-মায়ের রাগ ভাঙাতে কয়েকবার চেষ্টা করেও নিজের ঘরে প্রবেশ করতে পারেননি তিনি।
প্রতিকার চেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আত্মীয়স্বজন ও থানায় যোগাযোগ করেও ন্যায়বিচার পাননি বলে জানান এই প্রবাসী। তিনি বলেন, আমি একজন রেমিট্যান্সযোদ্ধা। ১৭ বছর বিদেশে পরিশ্রম করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠিয়েছি, পরিবারের সম্পদ গড়েছি। অথচ আজ নিজের ঘরেই আমার ঠাঁই নেই। সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই। আমার কোনো অন্যায় থাকলে তার সুষ্ঠু বিচার হোক, আর অন্যায় না থাকলে আমার উপার্জনে গড়ে তোলা সম্পদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
মোসারেফ জানান, পরিবারের অন্য সদস্যদের আপত্তি থাকলেও গত ৩১ জুলাই ছুটিতে এসে বাবার সম্মতিতে তিনি বিয়ে করেন। কিন্তু এরপর থেকেই পরিবারের মনোভাব বদলে যায়। এত বছর তার উপার্জনে সংসার চললেও এখন উল্টো তার কাছেই টাকা ও জমি পাওনা রয়েছে বলে দাবি করছে পরিবার। ১৬ লাখ টাকার এক মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে, যাতে দুদিন হাজতেও থাকতে হয়েছে বলে দাবি তার।
এ ছাড়া স্ত্রীর জন্য নিজের কেনা ১৫ ভরি সোনার গয়না থেকে এক ভরি ফেরত চাইলে পরিবার তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রবাসে পাঠানো অর্থ, অর্জিত সম্পদ ও গয়নার হিসাব চাওয়ায় বিরোধ আরও চরম আকার ধারণ করে। নিজের বাড়ি ছেড়ে এখন তাকে অন্যের বাড়িতে দিন কাটাতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজিব হোসেন বলেন, মোসারেফের টাকায় তার বাবা ও বোনেরা চলেন। তার উপার্জনেই গ্রামে আলিশান বাড়ি তৈরি হয়েছে। আমরা এলাকাবাসী চাই মোসারেফ ও তার পরিবার সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে থাকুক।
এদিকে মোসারেফের এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে বাড়িতে গেলে স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপর পরিবারের সদস্যরা চড়াও হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিষয়টি স্থানীয় ও পারিবারিকভাবে বসে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।
লালমোহন সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সত্যজিৎ কুমার ঘোষ জানান, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
