নিজের তৈরি খাদ্যে মাছ চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন আবুল কালাম

বাজারের প্রক্রিয়াজাত বাণিজ্যিক ফিডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজ হাতে প্রস্তুতকৃত সুষম খাদ্যে মাছ চাষ করে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছেন ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মাছচাষি আবুল কালাম কালা। খাদ্যের খরচ নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি গুণগত মান নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ মাছ উৎপাদনে তিনি এলাকায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এতে একদিকে যেমন মাছের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকছে, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত মাছ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৩ বছর আগে বাগমারা গ্রামের আবুল কালামের জীবনে শুরু হয় পরিবর্তনের গল্প। মাত্র ১৫০০ টাকা নিয়ে গ্রামের ছোট একটি পুকুর লিজ নিয়ে শুরু করেন মাছ চাষ। এখন তিনি ছোট-বড় ১৯টি পুকুর মাছ চাষ করছেন।
জমিয়ারগাঁও, বাগমারা ও চেঁটৈয়ার গ্রামে অবস্থিত এসব পুকুরের মোট আয়তন প্রায় ৫ দশমিক ৬৬ হেক্টর। দীর্ঘদিন ধরে মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত কালাম প্রচলিত বাজারনির্ভর খাবারের পাশাপাশি নিজের হাতে তৈরি খাদ্য ব্যবহার করছেন। এসব পুকুরে হাইব্রিড মাছ চাষের পরিবর্তে রুই, মৃগেল, কালিবাউশ, কাতলা, কার্প, সরপুঁটি, গ্রাস কার্প মাছ চাষ করা হচ্ছে।
মাছের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত উপকরণকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন তিনি। বাজারের বাণিজ্যিক খাদ্যের চড়া মূল্যের চ্যালেঞ্জকে জয় করতে তিনি অভিনব ও সাশ্রয়ী উপায় বেছে নিয়েছেন। নিজস্ব উদ্যোগে স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে মানসম্মত হাতে তৈরি মৎস্য খাদ্য প্রস্তুত করছেন। খাদ্য তৈরিতে খৈল, কুড়া, ভুসি, ফিশমিল, চিটাগুড় ইত্যাদি উপাদান ব্যবহার করেন। এ ধরনের খাদ্য ব্যবহার করে পুকুরের মাছ প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠছে। এতে মাছের খাবারের ওপর বাইরের নির্ভরতা কিছুটা কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে।
এ বিষয়ে আবুল কালাম বলেন, বাজার থেকে না কিনে নিজে খাবার তৈরি করি। প্রতিবছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু পোনা বিক্রি করি। নিজের উৎপাদিত খাদ্যে পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করায় মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খরচ কমিয়ে ভালো লাভ করা সম্ভব। বিগত ২০২৪ সালের বন্যায় চাষ করা সব পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। প্রায় ৬০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছিলাম। নতুনভাবে মাছ চাষ করে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছি।
মৎস্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মাছ চাষে সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত বা অনুপযুক্ত খাদ্য ব্যবহারে যেমন উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, তেমনি পুকুরের পানির গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই মাছের প্রজাতি, বয়স, ওজন এবং পানির পরিবেশ বিবেচনায় খাদ্য ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন।
পরশুরাম উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈয়দ মোস্তফা জামান জানান, আবুল কালাম একজন প্রান্তিক মৎস্যচাষি। মেধা, পরিশ্রম আর সঠিক দিকনির্দেশনাকে কাজে লাগিয়ে তিনি মৎস্যচাষে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে উৎপাদিত ফিড পণ্য মাছের মধ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য, মাইক্রো প্লাস্টিক, হেভি মেটালের উপস্থিতি রয়েছে। তবে মৎস্যচাষে এ ধরনের পদ্ধতিতে নিরাপদ মাছ উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব।

