logo
Advertisement

ঝালকাঠি/ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান, আতঙ্কে দিন কাটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,ঝালকাঠি
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান, আতঙ্কে দিন কাটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের
মাদ্রাসার ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে বের হয়ে এসেছে মরিচাধরা রড। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার কেওতা ঘিগড়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর মধ্যেই চলছে পাঠদান। মাদ্রাসাটিতে প্রায় ৪৫০ শিক্ষার্থী থাকলেও প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ ও অবকাঠামোর সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। বিজ্ঞান ভবনের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়া ঠেকাতে পলিথিন ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিভিন্ন সময় ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আহত হওয়ার পাশাপাশি টেবিল-চেয়ার ও বেঞ্চও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কেওতা ঘিগড়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসাটি রাজাপুর উপজেলার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এখানে প্রায় ৪৫০ শিক্ষার্থী, ২৯ শিক্ষক ও ছয় কর্মচারী রয়েছেন। শিক্ষার্থীর তুলনায় শ্রেণিকক্ষ ও অবকাঠামো পর্যাপ্ত না থাকায় পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। বৃষ্টির পানি ছাদ চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পড়ায় অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না। পানি ঠেকাতে বিজ্ঞান ভবনের ছাদে পলিথিন দিয়ে সাময়িক ব্যবস্থা করা হলেও এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। একই সঙ্গে পুরোনো ভবনের বিভিন্ন স্থান থেকে পলেস্তারা খসে পড়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থী নূর নাহার বলেন, অনেক দিনের পুরোনো ভবন। বিভিন্ন জায়গায় ক্ষতি হয়েছে। এই ভবনে ক্লাস করতে আমাদের ভয় হয়। কখন আবার ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে, সেই আতঙ্ক থাকে। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। আমরা একটি নতুন ভবন চাই, যাতে নিরাপদে ক্লাস করতে পারি।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সোয়াইব, আলিম, সুমাইয়াসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ায় তারা আতঙ্কে থাকে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানায় তারা।

শিক্ষার্থীরা আরও জানায়, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে ক্লাস করার সময় তাদের অনেকটা আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। বৃষ্টির দিনে ছাদ দিয়ে পানি পড়ায় বই-খাতা ও শিক্ষা উপকরণও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়া করার জন্য দ্রুত নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের দাবি তাদের।

গণিত শিক্ষক অনিক আহম্মেদ বলেন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান করতে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ার কারণে ক্লাস পরিচালনাও ব্যাহত হয়। একটি নতুন একাডেমিক ভবন হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ অনেক ভালো হবে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে পাঠদান নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। পুরোনো ভবনের সংস্কারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে একটি নতুন ভবন নির্মাণের বিকল্প নেই।

আইসিটি শিক্ষক খলিলুর রহমান বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকা জরুরি। নতুন একাডেমিক ভবন হলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। বর্তমানে শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয়ভাবে আইসিটি ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হলে শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ভবন হলে এ মাদ্রাসার শিক্ষার মান আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।

মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার মোবাশ্বের হোসাইন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো ভবনগুলো অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ভবনের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। পলিথিন দিয়ে কোনোভাবে পানি ঠেকিয়ে পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হলে শিক্ষার পরিবেশ অনেক উন্নত হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। কিন্তু তাদের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ভবন নির্মাণ হলে শ্রেণিকক্ষের সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে।

এদিকে মাদ্রাসাটির একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল। গত ১৮ আগস্ট দেওয়া চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণ ও অনগ্রসর পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। চিঠিতে মাদ্রাসাটির জন্য একাডেমিক ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল।

চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের পুরোনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। এ কারণে মাদ্রাসাটির একাডেমিক ভবন নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার অনুরোধ জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা কালাম, কামরুল ও নাজমুল হুদা চমন বলেন, এ মাদ্রাসা থেকে এলাকার বহু মানুষ পড়াশোনা করেছেন। এত পুরোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ভবন জরাজীর্ণ হয়ে থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে বিবেচনা করা উচিত।

তারা আরও বলেন, এলাকার শিক্ষা বিস্তারে মাদ্রাসাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানে শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীরাই নয়, অতীতে বহু মানুষ লেখাপড়া করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সে তুলনায় বাড়েনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েই উপকৃত হবেন।

স্থানীয়দের দাবি, একটি পুরোনো ভবন বারবার সাময়িকভাবে সংস্কার করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশও উন্নত হবে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, ভবনটি সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর বরাবর আবেদন করলে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ভবনটি যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।