Advertisement

মেঘনার চরে গরু-মহিষ চুরির ‘সিন্ডিকেট’, বাধা দিলেই হামলা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, লক্ষ্মীপুর
মেঘনার চরে গরু-মহিষ চুরির ‘সিন্ডিকেট’, বাধা দিলেই হামলা
মেঘনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চল। ছবি : এশিয়া পোস্ট

লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে প্রতি রাতেই ঘটছে গরু-মহিষ চুরির ঘটনা। চোরের দল লক্ষ্মীপুর থেকে পশু চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে ভোলার চরাঞ্চলে, আর ভোলা থেকে চুরি করা পশু আনা হচ্ছে লক্ষ্মীপুরে। এভাবেই গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী চুরির ‘সিন্ডিকেট’। এতে বাধা দিতে গিয়ে চোরের হামলার শিকার হচ্ছেন বাথান মালিক ও খামারিরা। সীমান্ত জটিলতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ‘টানাপোড়েন’।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর মেঘা ও রামমোহন চর বছরের পর বছর ধরে দখল করে রেখেছে কয়েকটি প্রভাবশালী পরিবার। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও তাদের প্রভাব খর্ব হয়নি। একই পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এই চোর সিন্ডিকেট অধরাই থেকে যাচ্ছে। আর এদের আশ্রয়েই চরে অবারিতভাবে চলছে চুরি ও ডাকাতি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ১ আগস্ট রাতে মেঘনার চরে ভোলা থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের পাঁচটি মহিষ চুরি করে নিয়ে আসে চোরের দল। পরে মহিষগুলো স্থানীয় সৈনিক লীগ নেতা গিয়াস উদ্দিনের মেঘার চরের বাথানের পাশে রেখে দেওয়া হয়। বর্তমানে মহিষগুলো গিয়াস তাঁর নিজের পালের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছেন বলে এলাকায় আলোচনা চলছে।

এর আগে গত ২৯ জুলাই ভোরে একই চরের কয়েকটি মহিষের বাথানে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত চোরের দল হামলা চালায়। এতে শাহজাহান, জুয়েল, জহির, নবী, নিজাম, কাদির ও রুবেল নামের কয়েকজন বাথানকর্মী গুরুতর আহত হন। আহতরা লক্ষ্মীপুর, ভোলা ও নোয়াখালী জেলার বাসিন্দা। ঘটনার সময় নগদ টাকা, মোবাইল ফোন ও মহিষ লুটে নেয় ডাকাত দলটি। আহতদের উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর ও ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মেঘনার চরে লক্ষ্মীপুরের পাশাপাশি ভোলা ও বরিশাল জেলার অংশ রয়েছে। সীমানা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এক জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অন্য জেলার ওপর দায় ঠেলে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাটে কোস্টগার্ডের কার্যালয় থাকলেও খবর পেয়েও তারা অভিযানে যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি—কোস্টগার্ডকে জানালে তারা বলে, ভোলায় মূল কার্যালয় থেকে নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত অভিযানে যাওয়া সম্ভব নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন বাথান মালিক জানান, প্রতি রাতেই কোনো না কোনো বাথানে চোর হানা দিচ্ছে। লাখ লাখ টাকা মূল্যের মহিষ চুরি করে মালিকদের নিঃস্ব করে দেওয়া হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে ভোলার রাসেল খা, মিন্টু খা, মামুন ও আরিফ আকন্দ এবং লক্ষ্মীপুরের শফি মাঝি, গিয়াস উদ্দিন, সালাহ উদ্দিন, সাদ্দাম হোসেন ও আবুল বাশার জড়িত। ইতিপূর্বে ছৈয়াল গ্রুপ, সরকার গ্রুপ ও আলমগীর গ্রুপ সক্রিয় থাকলেও বর্তমানেও নামে-বেনামে তাদের নেটওয়ার্ক কাজ করছে।

অভিযোগের বিষয়ে চররমনী মোহন ইউনিয়ন সৈনিক লীগের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, আমাদের নিজেদেরও মহিষের বাথান রয়েছে। প্রায় ১৫ দিন আগে আমাদের মহিষও চুরি হয়েছে। আমরা কোনো চুরির সঙ্গে জড়িত নই, আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

চররমনী মোহন ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবুল বাশার বলেন, গত রাতে পাঁচটি চোরাই মহিষ সালাহ উদ্দিনের ঘরের পাশে কে বা কারা রেখে গেছে বলে শুনেছি। পরে সেগুলো তারা পালের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়। আমার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক।

একই ইউনিয়নের কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে চোরাই গরু-মহিষ কেনাবেচায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে ভোলার বাসিন্দা রাসেল খা বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। চুরি বা হামলার ঘটনার সঙ্গে আমার বা আমার লোকজনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাট কোস্টগার্ড কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কন্টিনজেন্ট কমান্ডার নিজের নাম প্রকাশ না করে জানান, চরে গরু-মহিষ চুরির বিষয়টি তার জানা নেই।

লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, মহিষ চুরির ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত সপ্তাহেও এক চোরকে আটক করা হয়েছে। অনেক সময় জমির বিরোধের কারণেও একে অপরের পশু নিয়ে যায়। তা সত্ত্বেও ঘটনাগুলো নিয়ে ভোলা ও বরিশাল পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভোলা জেলার পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওছার বলেন, চরের ভোলা অংশে হামলার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।