মানিক পশারীর দোয়া অনুষ্ঠানে এসেছেন অনেক, তবুও আতঙ্ক কাটেনি পরিবারের

পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মানিক পশারীর দাফনে আতঙ্কে এলাকার অনেকে আসেননি। এরপর দোয়া অনুষ্ঠানে কিছু এলাকাবাসী উপস্থিত হয়েছিলেন। এরপরও পশারীর পরিবারের লোকজনের আশঙ্কা কাটেনি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মানিক পশারীর পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে সোমবার (১৬ অক্টোবর) বিকালে চিতলীয়া গ্রামের পশারী বাড়ির মসজিদে আসরের নামাজের পর পরিবারের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত দোয়ার আয়োজন করা হয়।
মানিক পশারীর ছোট ভাই চানমিয়ার ছেলে ইমরান বলেন, ‘রাত বেশি হওয়ায় আমরা দাফনে যেতে পারিনি। তবে ওইদিন দুপুরে আমি এবং আমার এক বড়ো ভাই রানাসহ কয়েকজন মিলে কবর খুঁড়েছিলাম। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে মসজিদে আমার চাচার নামে দোয়া করিয়েছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় দুইজন জানান, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ায় এলাকার অনেকে মানিক পশারীর দাফনের সময় যায়নি। তাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।
স্থানীয় মোবারেক নামে এক জেলে বলেন, ‘দাফন দেওয়ার আগে শনিবার (২৪ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কিছু লোক দাফন দেওয়ার জন্য রাখা কাটা বাস ও কবরের মাটি খুড়ে রাখা হলে সেগুলো ফেলে দেয়। এজন্য স্থানীয় অনেকে দাফনের সময় যায়নি। সঙ্গে মিথ্যা মামলারও ভয় ছিল আমাদের।’
মানিক পশারীর ছোট বোন হেনা বলেন, “জামায়াত-শিবিরের লোকজন আমার ভাইয়ের দাফনের আগে মিছিল করছিল। মানিক পশারীর মরদেহ এখানে দাফন করতে দেবে না বলে তারা মিছিলে ‘মানিক পশারীর দুই গালে’ জুতা মারো তালে তালে’ এ স্লোগানসহ নানা বাজে স্লোগানও দেয়। আমার আপত্তি হলো, আমার ভাই যেহেতু মুসলিম তাকে সেই ভাবে দাফন দিত। কেন তারা মিছিল দিল? তবে দাফনের পর থেকে কোনো সমস্যা হয়নি। এরপরও আমরা ভয়ে আছি।”
দাফনে কারা বাধা দিয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন এসব আমি বলব না। ৩-৪ দিন পরে বলব।’
হেনা আরও বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমাদের এলাকার কিছু আওয়ামী লীগের লোক এখন নব্য বিএনপি হয়েছে। একজন বিএনপির লোক আমাদের পুরাতন বাড়িতে জবরদখল করে ঘরও উঠিয়েছে।’
স্থানীয় গ্রাম পুলিশ মতিউর রহমান বলেন, “ঘটনার দিন রাত ১২টার দিকে ইউএনও স্যার আমাকে কল দিয়ে বলেন, ‘লাশ দাফন দিতে হবে। কবর ঠিক করার ব্যাবস্থা করো।’ পরে আমি পরিবারের লোকজনকে জানাই এবং স্থানীয় কোনো লোক না পাওয়ায় পশারীর দুই বোন ও এক মেয়ে কবরটির মধ্যে থাকা মাটি উঠিয়ে লাশটি দাফন করা হয়।”
বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা জহিরুল হক বলেন, ‘গত স্বৈরাচারী আমলে সাঈদীর নামে একটি মামলা হয়। মামলাটির সাক্ষী হিসেবে এই মানিক পশারী সাক্ষী দেন। পরবর্তীতে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ২০২০ সালে একটি যাচাই-বাছাই করেছিল, কাজেই আমরা নিশ্চিত না এবং সে কোনো জায়গায় যুদ্ধও করেনি। এখন সে মারা গিয়েছে, একজন মানুষ মারা গেলে তো তার ধর্মীয় অনুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এখানে বাধা দেওয়ার কিছু নেই। কেউ বাঁধাগ্রস্ত করলে এটা দেশের জন্য অমঙ্গল।’
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য ও জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন বলেন, ‘মরহুম আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের বিপক্ষে মিথ্যা সাক্ষী দিয়েছিল। এরপর মানিক পশারীকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজন উপহার স্বরূপ তার নাম স্পেশালভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করেছে। সাঈদী সাহেব কোনো রাজাকার ছিল না, ১৯৭১ সালে তাকে মানুষ চিনতও না এবং তিনি পিরোজপুরে ছিল না। তিনি একজন আন্তর্জাতিক মানের ভালো তাফসিরকারক। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ার কারণে একটি দল চেয়েছিল পিরোজপুরে যেন মানিক পশারীর মরদেহ দাফন না দেওয়া হয়।’
পিরোজপুর সদর থানার পুলিশ পরিদর্শক রাধেশ্যাম সরকার বলেন, ‘দাফনের পর এলাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো রকমের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’
উল্লেখ্য, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে মানিক পশারী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তার মেয়ের বাড়িতে দিলেন। এরপর গত দুই মাস ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। এরপর শনিবার সকাল ১০টার দিকে সেখানেই মারা যান। এরপর একই দিন দুপুর ১২টার দিকে পিরোজপুর শহরে মরদেহটি নিয়ে এলে স্থানীয় কিছু জামায়াত কর্মী ও বিক্ষুব্ধ জনতা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বাধা সৃষ্টি করেন। পরে ওইদিন রাত ১টার দিকে মানিক পশারীর মরদেহটি পুলিশ বাড়িতে নিয়ে এলে পরিবারের সদস্যরা দাফন কাজ সম্পন্ন করে।

-8507cb.jpg)

-5194e6.jpg)
