logo

মানিক পশারীর দোয়া অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অনেকে, তবু আতঙ্ক কাটেনি পরিবারের

মানিক পশারীর দোয়া অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অনেকে, তবু আতঙ্ক কাটেনি পরিবারের
মানিক পশারীর ছোট বোন হেনা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে পশারী বাড়ির মসজিদে আসরের নামাজের পর সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ দোয়ার আয়োজন করা হয়।

জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বাধার মুখে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আতঙ্কে এলাকার মানুষ মানিক পশারীর দাফনে অংশ নিতে না পারলেও সোমবারের দোয়া অনুষ্ঠানে এসেছিলেন অনেকেই। তারা সমবেদনা জানিয়েছেন পশারীর স্বজনদের প্রতি।

কিন্তু ঘটনার তিন দিন পর; পরিস্থিতি এখন অনেকটা স্বাভাবিক হলেও মানিক পশারীর পরিবারের সদস্যদের আতঙ্ক কাটেনি।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মানিক পশারীর ছোট বোন হেনা বলেন, “জামায়াত-শিবিরের লোকজন আমার ভাইয়ের দাফনের আগে মিছিল করছিল। মানিক পশারীর মরদেহ এখানে দাফন করতে দেবে না বলে তারা মিছিলে ‘মানিক পশারীর দুই গালে’ জুতা মারো তালে তালে’ বলে স্লোগান দেয়। এ সময় তারা অনেক বাজে স্লোগানও দেয়। আমার আপত্তি হলো, আমার ভাই যেহেতু মুসলিম তাকে সেই ভাবে দাফন দিত। কেন তারা মিছিল দিল? তবে দাফনের পর থেকে কোনো সমস্যা হয়নি। এরপরও আমরা ভয়ে আছি।”

মানিক পশারীর দাফনে যারা বাধা দিয়েছেন, তাদের পরিচয় এবং উদ্দেশ্য কী ছিল তা জানতে চাইলে হেনা বলেন, ‘এখন এসব আমি বলব না। ৩-৪ দিন পরে বলব।’

এ সময় তিনি অভিযোগে করেন, ৫ আগস্টের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেকে অন্য দলের পরিচয়ে তাদের (মানিক পশারীদের) পুরোনো বাড়ি দখল করে নিয়েছেন।

দাফনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মানিক পশারীর ছোট ভাই চান মিয়ার ছেলে ইমরান বলেন, ‘দাফনের দিন দুপুরে আমি এবং আমার এক বড়ভাই রানাসহ কয়েকজন মিলে কবর খুঁড়েছিলাম। কিন্তু রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় দাফনের সময় উপস্থিত থাকতে পারিনি। তবে আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে মসজিদে চাচার নামে দোয়া করিয়েছি।’

মোবারেক নামে স্থানীয় এক জেলে বলেন, ‘দাফনের জন্য বাঁশ ও কবরের মাটি খুঁড়ে রাখা হলেও সন্ধ্যায় কিছু লোক সেগুলো ফেলে দেয়। ঝামেলা এড়াতে অনেকে দাফনের সময় যায়নি। সঙ্গে মিথ্যা মামলারও ভয় ছিল আমাদের।’

স্থানীয় গ্রাম পুলিশ মতিউর রহমান বলেন, “ঘটনার দিন রাত ১২টার দিকে ইউএনও স্যার আমাকে কল দিয়ে বলেন, ‘লাশ দাফন দিতে হবে। কবর ঠিক করার ব্যাবস্থা করো।’ পরে আমি পরিবারের লোকজনকে জানাই এবং স্থানীয় কোনো লোক না পাওয়ায় পশারীর দুই বোন ও এক মেয়ে কবরটির মধ্যে থাকা মাটি উঠিয়ে লাশটি দাফন করা হয়।”

মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মির্জা জহিরুল হক বলেন, ‘গত স্বৈরাচারী আমলে সাঈদীর নামে একটি মামলা হয়। মামলাটির সাক্ষী হিসেবে এ মানিক পশারী সাক্ষী দেন। পরবর্তীতে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়। এখন তিনি মারা গিয়েছেন, একজন মানুষ মারা গেলে তো তার ধর্মীয় অনুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এখানে বাধা দেওয়ার কিছু নেই। কেউ বাধাগ্রস্ত করলে এটা দেশের জন্য অমঙ্গল।’

এ প্রসঙ্গে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য ও জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন বলেন, ‘সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ার কারণে একটি দল চেয়েছিল পিরোজপুরে যেন মানিক পশারীর মরদেহ দাফন না দেওয়া হয়।’

পিরোজপুর সদর থানার পুলিশ পরিদর্শক রাধেশ্যাম সরকার বলেন, ‘দাফনের পর এলাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো রকমের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তার মেয়ের বাড়িতে ছিলেন। এরপর গত দুই মাস ধরে তিনি অসুস্থ। এরপর শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে সেখানেই মারা যান। এরপর একই দিন দুপুর ১২টার দিকে পিরোজপুর শহরে মরদেহটি নিয়ে এলে স্থানীয় কিছু জামায়াত কর্মী ও বিক্ষুব্ধ জনতা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বাধা সৃষ্টি করেন। পরে ওইদিন রাত ১টার দিকে মানিক পশারীর মরদেহটি পুলিশ বাড়িতে নিয়ে এলে পরিবারের সদস্যরা দাফন কাজ সম্পন্ন করেন।