logo

বরিশালে সক্রিয় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং, প্রকাশ্যে অস্ত্র মহড়ায় আতঙ্ক

শাকিল মাহমুদ
বরিশাল
বরিশালে সক্রিয় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং, প্রকাশ্যে অস্ত্র মহড়ায় আতঙ্ক
কিশোর গ্যাং-এর মহড়া। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

মোটরসাইকেলে চড়ে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের মহড়া। এরপর নদীর তীরে গিয়ে একে অপরের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে সেই অস্ত্র। এমন একটি ভিডিও গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বরিশাল নগরীতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। উঠতি বয়সি কয়েক তরুণের অস্ত্র প্রদর্শনের ওই ভিডিও দেখে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন তরুণ মোটরসাইকেলে করে চলাচল করছেন। তাদের কাছে বড় আকারের ধারালো অস্ত্র রয়েছে। পরে নদীর তীরে গিয়ে একজন আরেকজনের হাতে অস্ত্র তুলে দেন। এ সময় একজনকে অস্ত্রটি কোমরে রাখার চেষ্টা করতেও দেখা যায়। অস্ত্রটি বড় হওয়ায় তিনি সেটি ঠিকমতো কোমরে রাখতে পারেননি।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পরও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা কেন নেওয়া হচ্ছে না। অস্ত্র উদ্ধার ও জড়িত ব্যক্তিদের আটকের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

অর্ধশতাধিক গ্যাংয়ের অভিযোগ

নগরীতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন এলাকায় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যদের বড় একটি অংশ উঠতি বয়সি তরুণ। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত দামি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল নিয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক, পাড়া-মহল্লা ও নদীতীরবর্তী এলাকায় তাদের ঘোরাফেরা ও মহড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু আড্ডা বা মোটরসাইকেল প্রদর্শন নয়, এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক, ছিনতাই, মারামারি ও ইভ টিজিংসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক যোগাযোগের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা একত্রিত হন। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজেদের গ্রুপ ব্যবহার করে সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ ও দলবদ্ধ হওয়ার কাজ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার আরেকটি দিক নিয়েও উদ্বিগ্ন নগরবাসী। অভিযোগ রয়েছে, অনেক গ্যাং সদস্য নিজেদের দাপট দেখাতে মোটরসাইকেল, অস্ত্র ও দলবদ্ধ চলাচলের ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। এতে অন্য কিশোরদের মধ্যেও অপরাধপ্রবণতা ও গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরিশাল জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও মহড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করছে। এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

কিশোর গ্যাংয়ের অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগের মধ্যে এর আগে বরিশাল সদর উপজেলার সাপানিয়া গ্রামের একটি মাছের ঘের থেকে দুইজনকে ১৪টি বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছিল। ওই ঘটনার পরও নগরীতে অস্ত্র হাতে কিশোরদের এমন ভিডিও সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, গ্যাং সদস্যদের কাছে অস্ত্রের উৎস কোথায় এবং কারা তাদের এসব অস্ত্র সরবরাহ করছে।

নগরবাসীর দাবি, শুধু বিচ্ছিন্নভাবে সদস্যদের আটক না করে কিশোর গ্যাংয়ের মূলহোতা, অস্ত্রের উৎস, মাদক সরবরাহকারী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সংগঠিত করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সুশান্ত সরকার বলেন, ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে চেষ্টা চলছে।