logo
Advertisement

খুলনা/খরস্রোতা শোলমারী এখন মরা খাল, বিপন্ন কৃষি-জীবিকা

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,খুলনা
খরস্রোতা শোলমারী এখন মরা খাল, বিপন্ন কৃষি-জীবিকা
পলি জমে ও নাব্যতা হারিয়ে সংকুচিত হয়ে পড়েছে খুলনার শোলমারী নদী। ছবি : এশিয়া পোস্ট

একসময় খরস্রোতা ছিল শোলমারী নদী। গভীরতা ও প্রশস্ততার কারণে নৌযান চলাচল, কৃষি, মৎস্য ও পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত নদীটি। এখন কোথাও সরু নালা, কোথাও প্রায় মরা খালের চেহারা নিয়েছে শোলমারী। পলি জমে ভরাট, দখল এবং অপরিকল্পিত বাঁধ ও স্লুইস গেটে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়।

খুলনার বটিয়াঘাটা ও ডুমুরিয়া উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া শোলমারী একসময় ছিল যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। নদীতে লঞ্চ চলাচলের সেই দৃশ্য এখন কেবল স্মৃতি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় নাব্যতা হারিয়ে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদীটি।

স্থানীয়দের দাবি, একসময় প্রায় ১৫০ মিটার প্রশস্ত নদীটির অনেক অংশ এখন মাত্র ৩ থেকে ৪ মিটারে সংকুচিত হয়েছে। ভাটার সময় কোথাও কোথাও নৌকা চলাচলও সম্ভব হয় না। এমনকি কোনো কোনো স্থানে মানুষ হেঁটেই নদী পার হন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শোলমারী নদীর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। পলি অপসারণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি এবং বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দখল ও পানিপ্রবাহের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা।

স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিন গোলদার বলেন, কৃষিতে আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ধান লাগানোর পরপরই বন্যার পানি ঢুকে ধান নষ্ট হয়ে যায়। বছরের একটি ফসলও ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারছি না।

নদীর পাড়ের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা তুরান হোসেন বলেন, একসময় শোলমারী নদী ছিল খরস্রোতা ও গভীর। সারা বছরই নদীতে পানির প্রবাহ ছিল। কিন্তু এখন বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ও অবকাঠামোর কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ধীরে ধীরে নাব্যতা কমে নদীটি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এতে কৃষি, মৎস্য ও পানি নিষ্কাশনসহ পুরো এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

নদীর নাব্যতা হারানোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। শোলমারী অববাহিকায় আমন ও বোরো ধান চাষের পাশাপাশি কমেছে সবজি উৎপাদনও। জলাবদ্ধতার কারণে ফসলি জমি থেকে সময়মতো পানি নিষ্কাশন করা যাচ্ছে না। ফলে চাষাবাদে অনিশ্চয়তা বাড়ছে কৃষকদের।

খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, নদী ও খালগুলো মরে যাওয়ার কারণে প্রায় ১ হাজার ৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ কমেছে। অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে, পেঁপে, মরিচ ও চুইঝালের গাছ পানি জমে যাওয়ার কারণে সহজেই মারা যাচ্ছে।

শুধু কৃষি নয়, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও সংকটে পড়েছে। শোলমারীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও জলাশয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অতিরিক্ত পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারছে না। এতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে নদীনির্ভর মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকাতেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

এই সংকট মোকাবিলায় শোলমারী নদীর একটি অংশ খননের উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। শোলমারী থেকে রামদিয়া পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার নদী খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

খুলনা পানি উন্নয়ন বিভাগ-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (পুর) মো. আতিকুর রহমান বলেন, শোলমারী নদীর সমস্যা সমাধানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় শোলমারী থেকে রামদিয়া পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার নদী খনন করা হবে।

তবে প্রশ্ন উঠছে, চার কিলোমিটার নদী খননেই কি শোলমারীর দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান হবে?

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশ থেকে পলি সরিয়ে নাব্যতা বাড়ানো প্রয়োজন হলেও শুধু খনন করে নদীকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে খননের পাশাপাশি দখল, দূষণ এবং পানিপ্রবাহের পথে থাকা অপরিকল্পিত অবকাঠামোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল্লাহ ইউসুফ আল হারুন বলেন, একটি নদীর নাব্যতা কমে গেলে শুধু নদীই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর প্রভাব পড়ে কৃষিজমি, খাল ও জলাশয়ের ওপরও। নদীর নাব্যতার ওপর পানি নিষ্কাশন ও প্রবাহ ব্যবস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে। তাই অল্প পরিসরে নদী খনন করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর পানি স্বাভাবিকভাবে সমুদ্রে গিয়ে পড়ার পথও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, খনন কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়। বিভিন্ন জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা স্লুইস গেট ও বাঁধের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং পার্শ্ববর্তী খাল-জলাশয়ে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে হবে। তাহলেই নদীকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

শোলমারীর সংকট তাই শুধু নদীর তলদেশে পলি জমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও জলাশয়ের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ-স্লুইস গেট এবং দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিও সংকটকে আরও জটিল করেছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়।

এ অবস্থায় শোলমারী থেকে রামদিয়া পর্যন্ত চার কিলোমিটার নদী খননের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ খননের পর আবার পলি জমে নদী ভরাট হলে কিংবা পানিপ্রবাহের পথে থাকা দখল ও অপরিকল্পিত বাঁধ-স্লুইস গেটের সমস্যা থেকে গেলে নদী খননের সুফল দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।

বিষয় :