Advertisement

ছেলে বিসিএস ক্যাডার, মেয়ে নার্স—৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করলেন আকবর

এশিয়া পোস্ট নিউজ, রাজশাহী
ছেলে বিসিএস ক্যাডার, মেয়ে নার্স—৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করলেন আকবর
আলী আকবর। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সংসারের চরম অভাব-অনটনে অষ্টম শ্রেণির পরই থমকে গিয়েছিল পড়াশোনা। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার দশক। জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে বিয়ে, সংসার সামলানো আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই চালিয়েছেন। নিজের পড়াশোনার স্বপ্নটা বুকের ভেতরে চাপা পড়ে থাকলেও সন্তানদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি।

Advertisement

সেই সন্তানদের একজন এখন বিসিএস ক্যাডার চিকিৎসক, অন্যজন নার্স। সন্তানরা কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এবার নিজের সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করলেন বাবা। ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৩৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার আলী আকবর।

আলী আকবর রাজশাহীর নওহাটা সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি উচ্চবিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার ‘বিল্ডিং মেইনটেন্যান্স’ ট্রেড থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তার এই অনন্য সাফল্যে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও আনন্দের জোয়ার বইছে। পেশায় তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মচারী।

আলী আকবর ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে দ্বিতীয়। ছোটবেলায় গ্রামের একটি মাদ্রাসায় তার পড়াশোনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৮৮ সালে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর বাবাকে সহযোগিতা করতে ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হন তিনি। ১৯৯০ সালে বিয়ে করেন। সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে আসার পর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

একসময় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রাজশাহীতে চলে আসেন আলী আকবর। সেখানে তিনি ও তার স্ত্রী একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি নেন। সীমিত আয়ের মধ্যে সংসার পরিচালনার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো সহজ ছিল না। তা সত্ত্বেও সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

আলী আকবরের মেয়ে ২০১৫ সালে নার্সিং পড়া শেষ করেন। এরপর ছেলেকে ভর্তি করান মেডিকেল কলেজে। ২০১৯ সালে এমবিবিএস পাস করেন ছেলে ইসমাইল হোসেন। পরে ৪২তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তিনি।

সন্তানরা একে একে স্বাবলম্বী হওয়ার পর আলী আকবরের মনে লুকিয়ে থাকা সেই পুরোনো স্বপ্নটি আবার জেগে ওঠে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন—যেভাবেই হোক আবার পড়াশোনা শুরু করবেন। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করলে স্ত্রী ও সন্তানরা তাকে সানন্দে উৎসাহ দেন। তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতায় তিনি স্কুলে ভর্তি হন।

নতুন করে পড়াশোনায় ফিরতে গিয়ে বয়সের কারণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও পিছিয়ে যাননি আলী আকবর। চাকরির পাশাপাশি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে পড়ালেখা চালিয়ে যান। অবশেষে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৩৫ অর্জনের গৌরব লাভ করেন।

নিজের এই সাফল্য সম্পর্কে আলী আকবর বলেন, পড়াশোনার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও অধ্যবসায় থাকলে সাফল্য অর্জন সম্ভব—আমি নিজের জীবন দিয়ে সেটাই দেখাতে চেয়েছি।

বর্তমান শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, এখন অনেক শিক্ষার্থী মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত সময় কাটিয়ে পড়ালেখার ক্ষতি করছে। আমি আমার সন্তানদের ক্ষেত্রে পড়াশোনাকে সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। ছেলে মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষে ওঠার পর এবং মেয়ে নার্সিং শেষ করার পর তাদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া হয়েছিল।

আলী আকবরের ছেলে বিসিএস চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন বলেন, বাবা অনেক দিন ধরেই আবার পড়াশোনা করার কথা বলতেন। পরিবারের সবাই তাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে পড়ার বিভিন্ন কাজে সাহায্য করেছেন। বাবা এসএসসি পাস করায় আমরা ভীষণ খুশি ও গর্বিত। আমরা চাই বাবা যেন উচ্চশিক্ষার পথেই এগিয়ে যান।

বিষয় :