logo

আশুলিয়া সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড/মামলায় মালিকপক্ষের নাম বাদ, আসামির তালিকায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা

মামলায় মালিকপক্ষের নাম বাদ, আসামির তালিকায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা
আশুলিয়ার জামগড়ায় প্রীতি গ্রুপের কারখানায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সিলিন্ডারগুলো। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সাভারের আশুলিয়ায় প্রীতি গ্রুপের কারখানায় ভয়াবহ এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে সাতজনের প্রাণহানির ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। তবে মামলায় প্রীতি গ্রুপের মালিকপক্ষের কারও নাম আসেনি। তালিকায় স্থান পেয়েছেন কেবল কারখানার জিএম, এজিএম, প্রকৌশলী ও হেলপারসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আশুলিয়ার জামগড়ায় প্রীতি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির এলপিজি প্ল্যান্ট এলাকায় বিপজ্জনক ও অরক্ষিত অবস্থায় রাখা সিলিন্ডার বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও বিকট বিস্ফোরণে কারখানার ভেতরে ও আশপাশে ছিটকে পড়া সিলিন্ডারের আঘাতে ও দগ্ধ হয়ে মোট সাতজন প্রাণ হারান। এতে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক ও পথচারী মারাত্মক দগ্ধ ও আহত হন।

এ ঘটনায় ২২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থানার জামগড়া পুলিশ ক্যাম্পের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু তালেব বাদী হয়ে একটি অবহেলাজনিত হত্যার মামলা দায়ের করেন।

মামলা বিবরণী অনুযায়ী আসামিরা হলেন—জিএম মো. সোহেল রানা, এজিএম মো. মহিউদ্দিন, ম্যানেজার মো. মোজাম্মেল হোসেন, কারখানার প্রকৌশলী মো. রাজীব হোসেন, হেলপার মো. আল আমীন ও মো. এনামুল। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় শীর্ষ ব্যবস্থাপনার দায় নিশ্চিত হলেও বাদ রাখা হয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রাজীব আহমেদ তালুকদারের পরিবারকে। প্রীতি গ্রুপের সিইও রাজীব আহমেদ তালুকদার (পিয়াল) কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহসম্পাদক ও বাকেরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তীতে বাকেরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ‘কাপ-পিরিচ’ প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার মা পারভীন তালুকদার প্রীতি গ্রুপের পরিচালক (ডিরেক্টর) এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল’ ও ‘প্রীতি উলওয়্যার’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তিনি বাকেরগঞ্জ উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের (বরিশাল) সংসদ সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া প্রীতি গ্রুপের মূল এমডি হিসেবে রয়েছেন রেজিন আহমেদ তালুকদার।

মামলা দায়েরের আগে প্রীতি গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক মো. মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আহত ও নিহতদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার চেষ্টা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। আর রাজীব আহমেদ (পিয়াল) সিইও পদে থাকলেও তিনি গত ৪-৫ বছর ধরে এই প্রজেক্টে নিয়মিত আসেন না, প্রজেক্টের কার্যক্রম মূলত এমডি রেজিন আহমেদ তালুকদার দেখভাল করেন। কারখানা পরিচালনা ও দায়িত্ব বণ্টন প্রজেক্টভিত্তিক আলাদা করা রয়েছে। এ ছাড়া সিলিন্ডার রিফিল বা সরবরাহের দায়িত্ব থার্ড পার্টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের, কারখানার নিজস্ব কোনো সিলিন্ডার তৈরির ব্যবস্থা নেই।

মামলায় কেবল কর্মচারীদের আসামি করার বিষয়ে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার কর্মকর্তা ইনচার্জ (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনায় আশুলিয়া থানায় ৯২ নম্বর মামলা করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে তাৎক্ষণিকভাবে যাদের দায়-দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেছে এজাহারে তাদের নাম আনা হয়েছে। মামলায় ১০-১২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। পরবর্তীতে তদন্তে যাদেরই গাফিলতি বা অনিয়মের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, সকলকেই আইনের আওতায় আনা হবে। তবে মালিকপক্ষের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে মালিকপক্ষকে আড়াল করে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসামি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটির সভাপতি মো. ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোনো কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ভার কেবল বেতনভুক্ত সাধারণ কর্মচারীদের ওপর চাপানো অযৌক্তিক। বড় পদে থাকা মালিক কিংবা নির্বাহী পরিচালকদের গাফিলতিতেই এমন দুর্ঘটনা ঘটে। যানবাহন দুর্ঘটনা হলে যেমন মালিকের দায় আসে, তেমনি কারখানার অগ্নিকাণ্ডেও মূল দায়িত্ব মালিকপক্ষের। সাধারণ কর্মচারীদের বলির পাঁঠা বানিয়ে মালিকদের আড়াল করা শ্রমিকদের সঙ্গে প্রহসন।

ঘটনার পর প্রীতি গ্রুপের এমডির ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় প্রীতি গ্রুপের এস সূহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কারখানা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গ্যাস সিলিন্ডারবাহী লরিতে আকস্মিক বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় লরির ভেতরে থাকা সিলিন্ডারগুলোতে আগুন ধরে যায় এবং আরও কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনে লরির ভেতরে ও আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা দগ্ধ হন। খবর পেয়ে জিরাবো ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ৪টি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা লরির ভেতর ও প্রাঙ্গণ থেকে মারাত্মক দগ্ধ অবস্থায় ৫টি মরদেহ উদ্ধার করেন।

বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শক্তিতে লরি বা সিলিন্ডারের একটি অংশ ২০০ গজ দূরে ছিটকে গিয়ে কাপড়ের দোকানের সামনে বসে থাকা মোছাম্মৎ জয়নব বেগম (৫৫) নামের এক নারী পথচারীর মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া দগ্ধ ও গুরুতর আহত অন্তত ২৫-২৬ জনকে উদ্ধার করে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বুলবুল হোসেন (৪৫) ও নজরুল ইসলাম (৪২)।