ঈদের আনন্দ নেই সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষক পরিবারে

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের মধ্যনগর উপজেলার বংশিকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের রংচি গ্রামের কৃষক আইন উদ্দিন। এই বছর তিনি ৮ কিয়ার জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করেছিলেন। তলিয়ে গেছে দুই কিয়ারের বেশি জমি।
অন্য জমির ধান কাটতে পারলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সময়মতো ধান মাড়াই ও শুকাতে না পারার কারণে অনেক ধান নষ্ট হয়েছে।
আইন উদ্দিনের স্ত্রী কৃষাণী মদিনা আক্তার কষ্টের সূরে বললেন, এই বছর ঈদ কী দিয়া করব। পরিবারে ছোট-বড় ৭ জন মানুষ। ঘরে ধান, টাকা-পয়সা নাই। কী দিয়া ঈদ আন্দ করব, টেনশানে ভিতর ভরা। বাচ্ছা-কাচ্ছা চিল্লায় জামা আইন্না দেও, জুতা আইন্না দেও। কিতা দিয়া কিইন্না দিতাম। কামাইয়েরও কোনো সুযোগ নাই। হাওরে কোন কাম-কাজ নাই। কীভাবে সারা বছর চলতাম এইডাই চিন্তা।
শুধু মদিনা আক্তারই নন, সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের অনেক কৃষক পরিবারে মনে এ বছর ঈদের আনন্দ নেই। বৈশাখের শুরুতেই অতিবৃষ্টিতে তলিয়েছে হাওরের বোরো ধান। ধানের সঙ্গে তলিয়ে গেছে লাখো কৃষকের সোনালী স্বপ্ন। এখন সারা বছর কীভাবে চলবেন এই চিন্তায় আছেন তারা।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের এক (মে) মাসের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। উপজেলা পর্যায়ে সেই বরাদ্দ ছাড় হয়েছে। প্রকৃত কৃষকদের মাঝে সেগুলো বিতরণ করা হচ্ছে।
পবিত্র ঈদুল আজহার প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে শাল্লা উপজেলার ইয়ারাবাদ গ্রামের কৃষক এরশাদ আলী বললেন, এইবার হাওরে ঈদ নাই, বৈখাশ মাসই সব ধান পানিত তলাইয়া গেছে। এখন সারা বছর কীভাবে চলতাম, খাইতাম এইডাই বড় চিন্তা। ঘর ধান থাকলে কিছু বিক্রি কইরা কাপড়-চোপড় ও ঈদের বাজার করতাম। ঈদের আগে সরকারি সাহায্য-সহযোগিতাও পাওয়া গেলে ভালা অইত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মওসুমে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমি চাষাবাদ হয়েছিল। উৎপাদন লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১৪ লাখ টন ধান। মার্চের শেষ দিকেই সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টি শুরু হয়। এরপর লাগাতার বৃষ্টিতে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ডুবে যায় জেলার সবকয়টি ছোট বড় হাওরের নিচু এলাকা। অতিবৃষ্টি, শিলা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় জেলায় ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওরে ধান কাটা প্রায় শেষ।
সুনামগঞ্জে আছে প্রায় চার লাখ কৃষক পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও কৃষক সংগঠনের দাবি প্রায় অর্ধেক জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকদের দাবি, নিচু এলাকার প্রায় এক লাখ হেক্টরের বেশি জমি ডুবে ছিল। কিছু ধান পানির নিচ থেকে কৃষকরা তুলে আনলেও রোদ না থাকায় চারা গজিয়ে ও পচে নষ্ট হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের এক লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত ১৪ মে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চূড়ান্ত করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। গতকাল রোববার ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের জন্য নগদ ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি চাল এক (মে) মাসের বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে। অন্য কৃষকদের সহায়তা প্রদানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রামের কৃষক মুহিবুর রহমান বলেন, প্রায় এক লাখ টাকা খরচ কইরা ৭ কিয়ার জমিন বর্গা চাষ করছিলাম, মেঘের পাইন্নে সব শেষ অইয়া গেছে। ১৫-২০ মণ ধান পাইছি। ৭ জন মানুষ, সারা বছর চাউল কিইন্না খাইতো অইবো। ঈদের সময় নতুন কাপড়-ছোপড় কিনি, এইবার কাপড় কেনার মতো টেকা-পয়সা নাই।
হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সুনামগঞ্জ জেলার সভাপতি রাজু আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা প্রদানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের কৃষকদের সহায়তা প্রদানের তালিকা ও সহায়তা প্রদান এখনও দৃশ্যমান হচ্ছে না। তালিকা নিয়ে লুকোচুরি তৈরি হয়েছে। হাওরপাড়ের কৃষক পরিবারে হাহাকার চলছে। কৃষকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে ঈদ উযদাপন করবেন সেই চিন্তায় আছেন। ঈদের আগেই কৃষকদের হাতে তুলে দিতে হবে, তাহলে কিছুটা উপকার হবে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক দুইজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও মুখ্য সচিব সুনামগঞ্জে এসে মানবিক সহায়তার কার্যক্রমের উদ্বোধন করে গেছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জেলার ১২ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এক লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ কৃষক পরিবারের তালিকা প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। প্রত্যেক কৃষক পরিবার নগদ ৪ হাজার টাকা ও ২০ কেজি করে চাল প্রদানের একটি প্রস্তাব ছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের এক (মে) মাসের বরাদ্দ পাওয়া গেছে। তালিকার অন্য কৃষকদের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। যারা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদেরকে দেওয়া হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছে সহায়তা তোলে দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
গত ৫ মে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় বোরো ফসলহারা ৪০০ জন কৃষককে নগদ ৭ হাজার টাকা ২০ কেজি করে চাল দিয়ে তিন মাসব্যাপী সহায়তা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
