logo
বাসের ধাক্কায় পুলিশ সদস্য নিহত

‘আমি কীভাবে বাঁচব, আড়াই মাসের মেয়ে কাকে বাবা বলবে’

‘আমি কীভাবে বাঁচব, আড়াই মাসের মেয়ে কাকে বাবা বলবে’
পুলিশ কনস্টেবল আলামিন। ছবি: পারিবারিক সূত্রে পাওয়া

‘আমি এখন কীভাবে বেঁচে থাকব। আমার আড়াই মাসের মেয়ে নিয়ে কার দুয়ারে যাব? আমার মেয়ে কাকে বাবা বলে ডাকবে? আল্লাহ, তুমি আমারে এত অল্প বয়সে কী করলা?’—কোলে আড়াই মাসের নিষ্পাপ শিশুকন্যাকে জড়িয়ে ধরে অবিরত কেঁদে কেঁদে এভাবেই করুণ আকুতি জানাচ্ছিলেন নিহত পুলিশ কনস্টেবল আলামিনের স্ত্রী ইশরাত জাহান রিয়া।

চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে বাসের ধাক্কায় আলামিনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে তার গ্রাম মাদারীপুর সদর উপজেলার উত্তর দুধখালীতে এখন শোকের মাতম। ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে পঞ্চম আলামিন মাত্র আড়াই মাস আগে এক কন্যাসন্তানের বাবা হন। অবুঝ শিশুটি বাবার মুখ চিনে ওঠার আগেই মাথার ওপর থেকে সরে গেল বাবার স্নেহের ছায়া।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রোববার (৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার ওয়াসা মোড় এলাকায় জমিয়াতুল ফালাহ জামে মসজিদের সামনে চেকপোস্টের দায়িত্ব পালন করছিলেন কনস্টেবল আলামিনসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। এ সময় সন্দেহজনকভাবে তিন যুবককে হাঁটতে দেখে পুলিশ সদস্যরা তাদের থামার সংকেত দেন। কিন্তু তাদের একজন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তাকে আটকাতে সামনে থেকে ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে মোটরসাইকেল নিয়ে মসজিদের পশ্চিম গেটের দিকে এগিয়ে যান আলামিন। তখনই ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

পেছন দিক থেকে দ্রুতগতির একটি বাস এসে আলামিনের মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে যান তিনি। এরপর বাসটি তাকে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ গজ পর্যন্ত টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (৫ অক্টোবর) ভোরে মারা যান তিনি।

আলামিনের মা সেলিনা বেগম বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমার বাবায় পুলিশ অইছিল, বুকটা ভইরা গেছিল। হেই বুকটা এহন খালি অইয়া গেছে রে! আমার বাবায় জানি কত কষ্ট পাইয়া মরছে।’ যে ছেলেকে পুলিশে চাকরি পাওয়ার পর বুকভরা গর্বে দেখতেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেই ছেলেকেই হারিয়ে এখন শূন্য তার বুক।

বাবার সঙ্গে ছেলের শেষ ছবি। ছবি : পারিবারিক সূত্রে পাওয়া
বাবার সঙ্গে ছেলের শেষ ছবি। ছবি : পারিবারিক সূত্রে পাওয়া

ছেলের মৃত্যুর খবর কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না বাবা আব্দুল হক সরদার। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘কয়দিন আগে ছুটিতে আইছিল আলামিন। শুক্রবার জুমার পরে আমার সঙ্গে ছবি তুলছিল। আমি তো বুঝি নাই যে এইডাই আমার বাবার সঙ্গে আমার শেষ ছবি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার সাত সন্তানের মধ্যে আলামিন ছিল সবচেয়ে নম্রভদ্র। পুলিশে চাকরি করার কারণে ওকে নিয়ে আমাদের অনেক গর্ব ছিল। আজ সেই ছেলেটাই নাই।’

আলামিনের একমাত্র বোন হালিমার কণ্ঠেও শোকের ভার। তিনি বলেন, ‘আমার একটা ভাই পুলিশ হইছে, আমরা যে কত গর্ব করছি! আল্লাহ যে আমার ভাইরে এত তাড়াতাড়ি নিয়া যাইব, আমরা তো তা জানতাম না।’

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আলামিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়নি। সোমবার রাত ১০টায় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা রয়েছে।

মাদারীপুর সদর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমাদের একজন পুলিশ সদস্য এভাবে চলে যাওয়া কাম্য নয়। আমি তার রুহের মাগফেরাত কামনা করছি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।