মা নেই, পিটুনিতে প্রাণ গেল বাবার—২৫ মাসেই এতিম মুসলিমা

এক হাতে ফিডার, অন্য হাতে দাদির আঁচল; গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। ফরিদপুরের বোয়ালমারীর সাতৈর গ্রামের ২৫ মাসের মুসলিমা ইসলামের জীবন এখন এমনই নির্মম। জন্মের ২১ দিন পর মা ছেড়ে যান। আর গত শুক্রবার (১ মে) রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দায় জনতার পিটুনিতে প্রাণ হারান তার বাবা, ট্রাকচালক হান্নান শেখ (৪৩)। অল্প বয়সেই মা-বাবা দুজনকেই হারিয়ে নিঃসঙ্গ জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে শিশুটি।
শনিবার (২ মে) বিকেল ৩টার দিকে গ্রামের বাড়িতে আনা হয় গণপিটুনিতে নিহত হান্নান শেখের মরদেহ। পরে বাদ আসর সাতৈর শাহী জামে মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে সাতৈর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এদিকে হান্নানের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে বাড়ির আশপাশের পরিবেশ। উঠানে স্বজনদের আহাজারির মাঝখানে কিছুই না বুঝে কখনও দাদির কোলে, আবার কখনও স্বজনদের কোলে ঘুরছে মুসলিমা। কখনও ফিডারের দুধ মুখে দিয়ে চুপচাপ, আবার হঠাৎ ফিডার সরিয়ে হাউমাউ করে কান্না। চারপাশের শোক যেন তার ছোট্ট বুকেও ঢেউ তুলছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুসলিমার মা তার জন্মের ২১ দিন পর স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যান। এরপর থেকে দাদা শাহিদ শেখ ও দাদি নার্গিস বেগমই তাকে লালন-পালন করছেন। রোবাবর দাদি নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মা ২১ দিনেই চলে গেছে, এখন বাপও নাই। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি না থাকলে ও কোথায় যাবে?’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ছেলের মাথা ৪-৫ ভাগ করেছে, হাত-পা ভেঙে ফেলা হয়েছে, শরীরের কোথাও দাগ ছাড়া নাই। আমার ছেলেকে গুজব ছড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
নিহতের বাবা শাহিদ শেখ বলেন, ‘আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। সে অপরাধ করে থাকলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এখন এই বাচ্চার ভবিষ্যৎ কী হবে?’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১ মে) রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় একটি দ্রুতগতির ট্রাক কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেয়—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। পরে ‘ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে’ এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন ইট-ব্লক ফেলে সড়ক অবরোধ করে ট্রাকটি থামায় এবং চালক হান্নান শেখকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করে।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। শনিবার বাদ আসর সাতৈর শাহী জামে মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া স্থানীয় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠায়। অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।