logo
Advertisement

শিল্পের বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত বরিশাল

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,বরিশাল
শিল্পের বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত বরিশাল
পোড়া টায়ারের তীব্র গন্ধ ও বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বরিশালে অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়নের ফলে চরম পরিবেশদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শিল্পের চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও রাসায়নিক বর্জ্যে ভারী হয়ে উঠেছে দক্ষিণাঞ্চলের এই প্রধান শহরের বাতাস। শহরের উপকণ্ঠ থেকে শুরু করে বিসিক শিল্প এলাকা পর্যন্ত সর্বত্রই বর্জ্যের স্তূপ ও বিষাক্ত ধোঁয়ার আধিপত্য দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন, মানববন্ধন ও প্রশাসনকে লিখিত অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা।

দূষণের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র মিলেছে বাবুগঞ্জের সুগন্ধা নদীর তীরে অবস্থিত ‘পায়রা রিসাইক্লিং প্লান্ট’-এ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলা কারখানাটিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চললেও রাত নামলেই পরিস্থিতি বদলে যায়। সেখানে পোড়ানো হয় পুরোনো টায়ার ও রাবার। এর ফলে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে পোড়া টায়ারের তীব্র গন্ধ ও বিষাক্ত কালো ধোঁয়া।

স্থানীয়দের দাবি, কারখানাটিতে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ টন পুরোনো টায়ার ও রাবার পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়। এই কার্যক্রমের ফলে শুধু বাতাসই দূষিত হচ্ছে না, আশপাশের কৃষিজমিতেও কালো ধুলা পড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যা বাড়ছে বলেও অভিযোগ তাদের। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ, আবেদন ও মানববন্ধন হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ বলেন, পায়রা রিসাইক্লিং প্লান্টের আশপাশে যেমন বসতবাড়ি রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তার অভিযোগ, পরিবেশের নিয়মনীতি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার ভাষায়, এলাকার মানুষের জীবন এখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শিশু ও বয়স্কদের অনেকেই নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

রিমা নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও পোড়া টায়ারের তীব্র গন্ধ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। এই গন্ধ যেন ঘরের মধ্যেই স্থায়ী হয়ে আছে। সন্তানদের স্বাস্থ্য নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

সালাম নামের আরেক বাসিন্দার অভিযোগ, পায়রা রিসাইক্লিং প্লান্ট নিয়ে বিভিন্ন সময় অভিযোগ করা হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। আমরা চাই বাঁচতে। আমাদের বাঁচান।

স্থানীয়দের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে পায়রা রিসাইক্লিং প্লান্ট কর্তৃপক্ষ। কারখানাটির স্কেল অপারেটর মুশফিকুর রহমান বলেন, সেখানে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ টন পুরোনো টায়ার ও রাবার পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় গ্রিন অয়েল, কার্বন ও স্ক্র্যাপ উৎপাদিত হয়। এসব পণ্য সড়ক নির্মাণ, ইটভাটার জ্বালানি, রংসহ বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মুশফিকুর রহমানের দাবি, পরিবেশের সব নিয়ম মেনেই কারখানার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও কোনো অনিয়ম হওয়ার সুযোগ নেই।

পায়রা রিসাইক্লিং প্লান্টকে ঘিরে ওঠা অভিযোগই বরিশালের শিল্পদূষণের পুরো চিত্র নয়। বিসিক শিল্প এলাকা ও শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। বিসিক শিল্প এলাকাসহ মাঠপর্যায়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আশপাশে খোলা জায়গায় শিল্পবর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও বর্জ্যের স্তূপ, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পরিত্যক্ত উপকরণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং আশপাশের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দূষণের প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানার শ্রমিকদের ওপরও। মেহেদী নামের এক শ্রমিক বলেন, তাদের অনেকের শরীরে চর্মরোগ হয়েছে। অনেকে শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তার মতে, শিল্পবর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। রফিক ও সেলিমা নামের আরও দুই শ্রমিকও দূষিত পরিবেশে কাজ করার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানান।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশালে বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ‘লাল শ্রেণিভুক্ত’। তালিকায় রয়েছে গ্রামীণ জি.সি চক্ষু হাসপাতাল, বরিশাল ইসলামী হাসপাতাল, বরিশাল সামিট পাওয়ার লিমিটেড, বিডি পেইন্টস লিমিটেড ও অপসোনিন বাল্ক ড্রাগস।

বরিশাল বিসিক শিল্প এলাকায় বিডি পেইন্টস লিমিটেডে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ। সেখানে হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক ছিলেন। প্রতিষ্ঠানের হেলপার হাফিজুর রহমান বলেন, একসময় ৩০ জন কাজ করলেও বর্তমানে কাজ করছেন আটজন। কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।

হাফিজুর রহমানের দাবি, বরিশালে তাদের কার্যক্রম পরিবেশের নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কেন লাল শ্রেণিভুক্ত, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।

বরিশাল সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ডেপুটি প্ল্যান্ট ম্যানেজার আবু বকর সাদিকও পরিবেশদূষণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের প্রতিষ্ঠান জড়িত নয়। প্রতিষ্ঠানটি কেন লাল শ্রেণিভুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলবেন তারা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বাইন বলেন, শুধু বরিশাল জেলাতেই প্রায় অর্ধশত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। বেলা ইতিমধ্যে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় দূষণের ঘটনায় ১৫টি মামলা করেছে। বছরের পর বছর আন্দোলন ও মামলা হলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়া নজরদারি ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে।

তিনি আরও বলেন, মানুষের স্বাস্থ্য ও কৃষিজমি ধ্বংস করে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে পারে না। ব্যর্থ কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বরিশাল জেলার সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এখন অনেক ক্ষেত্রে শুধু কাগজের অনুমোদন হয়ে দাঁড়িয়েছে কি না, সেটিই খতিয়ে দেখা জরুরি। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র পাওয়ার পর বাস্তবে তার শর্ত মানছে কি না, তা নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোরভাবে যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু বছরের পর বছর অভিযোগ থাকার পরও যদি দূষণ চলতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—নজরদারি কোথায়, আর আইন প্রয়োগই বা হচ্ছে কতটা।

তিনি বলেন, শিল্পকারখানার বর্জ্য খোলা জায়গায় পড়ে থাকবে, ধোঁয়া ও দুর্গন্ধে মানুষ অতিষ্ঠ হবে, শ্রমিকেরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকবেন আর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো শুধু অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দূষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী প্রতিষ্ঠানকে শুধু সতর্ক করে ছেড়ে না দিয়ে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে পরিবেশগত ছাড়পত্র বাতিল ও কার্যক্রম বন্ধের মতো পদক্ষেপও নিতে হবে।

রনজিৎ দত্ত আরও বলেন, শিল্পায়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু মানুষের জীবন ও পরিবেশ ধ্বংস করে শিল্পায়ন কোনো উন্নয়ন হতে পারে না। একটি কারখানা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে বলে সেই কারখানাকে মানুষের নিঃশ্বাস বিষিয়ে তোলার লাইসেন্স দেওয়া যায় না। পরিবেশ রক্ষার আইন যদি প্রয়োগ না হয়, তাহলে আইন থাকারই বা অর্থ কী। এখন প্রয়োজন লোকদেখানো অভিযান নয়, নিয়মিত নজরদারি, দূষণের বৈজ্ঞানিক পরিমাপ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা। শিল্পের চাকা চলবে, কিন্তু সেই চাকার ধোঁয়া ও বর্জ্যের দায় কোনোভাবেই সাধারণ মানুষকে বহন করতে দেওয়া যাবে না।

বরিশাল জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দীন বলেন, দূষণের বিরুদ্ধে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে রয়েছেন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পরিবেশদূষণের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে, সে যত ক্ষমতাবানই হোক, আইনের বাইরে থাকার সুযোগ নেই।