logo

খুলনা সিটি করপোরেশন/তপশিলের আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, আলোচনায় যারা

মাসুম বিল্লাহ ইমরান
খুলনা
তপশিলের আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ, আলোচনায় যারা
খুলনা সিটি করপোরেশনে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কোলাজ ছবি

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তপশিল এখনও ঘোষণা করা হয়নি। তার আগেই মেয়র পদ ঘিরে খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আগাম তৎপরতা। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে চলছে আলোচনা, জনসংযোগ ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি। এর মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় তপশিল ঘোষণার আগেই জমে উঠছে মনোনয়ন দৌড়।

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার-ব্যানার দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক ও জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন তারা। কয়েকটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতাও শুরু হয়েছে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ২০২৬ সালের ১ মার্চ তিনি কেসিসির প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন।

বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের আলোচনায় নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পাশাপাশি রয়েছেন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন, এবং মহানগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা চৌধুরী সাগরসহ আরও কয়েকজন।

কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘দল থেকে সিটি নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি। আগে ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচন। এরপর সিটি নির্বাচন। আমাকে প্রধানমন্ত্রী যে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেটি পালন করে যাচ্ছি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরবাসীর জন্য কাজ করছি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই করব না।’

মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘দলীয় নেতাকর্মীরা চান আমি তাদের প্রার্থী হই। আমি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের কাছে কোনো আসনের মনোনয়ন চাইনি। আমি সিটি করপোরেশন নির্বাচন করব, এ কারণেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো জায়গায় আবেদন করিনি। দল মনোনয়ন দিলে আমি অবশ্যই নির্বাচন করব।’

তিনি বলেন, ‘আমি জেলা ইউনিটের সভাপতি ছিলাম। আমাকে দিয়ে সিটি করপোরেশন নির্বাচন করাবেন—এমন পরিকল্পনা থেকেই হয়তো বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি করেছেন।’

মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিনও মেয়র পদে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তিনি বলেন, দল তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচন করবেন। দলের মূল স্রোতের সঙ্গে থাকা এবং নেতাকর্মীদের পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হলে দলের ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

তুহিন বলেন, ‘মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকেও একজনের নাম সুপারিশ করা হবে। শেষ পর্যন্ত দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হলে দল তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’

মহানগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা চৌধুরী সাগরও মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচন হবে। আওয়ামী লীগের আমলের মতো নির্বাচন আর হবে না। এবার সৎ, যোগ্য ও তরুণ নেতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পার্লামেন্টে ও রাজনীতিতে তরুণদের আগমন ঘটছে। তাই এখন আর পুরোনো দিনের মতো নির্বাচন হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘দল যদি তরুণদের মধ্য থেকে আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমিও সিটি মেয়র পদে নির্বাচন করব। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারুণ্যনির্ভর হওয়ায় আমি শতভাগ আশাবাদী। বিগত দিনে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে খুলনার রাজপথে ছিলাম।’

এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীও প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে। অধিকাংশ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীও চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

জামায়াতের মেয়র প্রার্থী অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘জামায়াত দ্বিতীয়বারের মতো এখানে মেয়র নির্বাচন করছে। এর আগে ছাতা প্রতীক নিয়ে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচন করেছিলেন। আমরা কেসিসি মেয়র পদে জয় নিয়ে শতভাগ আশাবাদী। খুলনা-২ ও খুলনা-৩ আসন নিয়ে কেসিসির নির্বাচন। গত সংসদ নির্বাচনে এই দুটি আসন থেকে সাধারণ মানুষ আমাদের পক্ষে ব্যাপক সাড়া দিয়েছে। আশা করি কেসিসি নির্বাচনে জনগণ আমাদের পাশে থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করে ফেলেছি।’

অন্যদিকে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন এস এম মুশফিকুর রহমান। তিনি ২০১৮ ও ২০২৩ সালের কেসিসি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আগে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করলেও এবার আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করব।’ বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও জামায়াতের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এবার নগরবাসী তাকে মেয়র নির্বাচিত করবেন বলে আশাবাদী।’

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খুলনা মহানগর সভাপতি মুফতি ইমরান হোসাইন বলেন, ‘দলের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি নিজ থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন না। সংগঠন যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকেই প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘দল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি নির্বাচনে কোনো প্রার্থী ঘোষণা দেয়নি। বিগত নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা এবং খুলনাবাসীর চাহিদার আলোকে নতুন নতুন কৌশল নিয়ে ইনশাআল্লাহ নির্বাচনে আমরা অংশগ্রহণ করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিগত কেন্দ্রীয় শুরা বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আপাতত আমরা কোনো জোট বা সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব না। এককভাবেই নির্বাচন করব ইনশাআল্লাহ।’

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও কেসিসি নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। খুলনা মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আহম্মদ হামীম রাহাত বলেন, ‘এখনো চূড়ান্তভাবে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই ও তালিকা সংগ্রহের কাজ চলছে।’

তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠনের কারণে এ প্রক্রিয়ায় কিছুটা ধীরগতি ছিল, তা এখন আর থাকবে না। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে খুলনার কাঙ্ক্ষিত মেয়র প্রার্থীকে চূড়ান্ত করে ঘোষণা দিতে পারব।’

তপশিল ঘোষণার আগেই মেয়র পদ ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের এমন তৎপরতায় খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গনে কেসিসি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিএনপিতে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় দলটির প্রার্থী বাছাই নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও এনসিপিও প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তপশিল ঘোষণার পর দলগুলোর প্রার্থী ও নির্বাচনী কৌশল আরও স্পষ্ট হবে।

খুলনা সিটি করপোরেশন ১৯৮৪ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠার পর প্রথম সরাসরি মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৪ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শেখ তৈয়বুর রহমান প্রথম নির্বাচিত মেয়র হন। তিনি ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে বিএনপির মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি মেয়র নির্বাচিত হলেও ২০১৮ সালে আবারও তালুকদার আব্দুল খালেক মেয়র হন। ২০২৩ সালের নির্বাচনেও তিনি জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে যাওয়া থেকে নির্বাচিত মেয়রের পদ শূন্য রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১ মার্চ খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে কেসিসির প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন।

এখন পর্যন্ত নগরীতে ভোটার পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯১ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৭৭ হাজার ৯০৬ ও নারী দুই লাখ ৭৯ হাজার ৯৬৭ জন। ১৯৮৪ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কেসিসিতে ২০ জন মেয়র দায়িত্ব পালন করেছেন।