logo

২০ বছরেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি পিরোজপুর বাস টার্মিনালে

২০ বছরেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি পিরোজপুর বাস টার্মিনালে
পিরোজপুর বাস টার্মিনালের বেহাল অবস্থা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একটু বৃষ্টি হলেই যেন ছোট ছোট হ্রদে পরিণত হয় পিরোজপুরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কাদায় ভরা গর্ত। সেই পানি-কাদা মাড়িয়েই বাসে উঠতে হয় যাত্রীদের। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে থাকায় অনেক সময় বোঝার উপায় থাকে না—কোথায় গর্ত, কোথায় রাস্তা। ফলে বাস, অটোরিকশা, রিকশা কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে টার্মিনালে ঢুকলেই তৈরি হয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

শুধু বৃষ্টির সময়ই নয়, বছরের অধিকাংশ সময়ই খানাখন্দ, ধুলা-কাদা আর অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয় যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের। নির্মাণের ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও টার্মিনালটির বড় ধরনের সংস্কার বা আধুনিকায়ন হয়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবহনকেন্দ্রটি এখন অনেকটাই বেহাল।

পিরোজপুর শহরের বাইপাস সড়কের পাশে মাছিমপুর এলাকায় ২০০৬ সালে নির্মাণ করা হয় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি। নির্মাণের সময় যে পরিমাণ যানবাহন ও যাত্রী চলাচলের কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তার তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ। বর্তমানে টার্মিনাল থেকে প্রায় ১৪টি রুটে প্রতিদিন ৬ শতাধিক বাস ও মিনিবাস চলাচল করে। এসব যানবাহনে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক যানবাহন ও যাত্রীর জন্য টার্মিনালের অবকাঠামো সেই পুরোনো অবস্থাতেই রয়ে গেছে।

বর্ষা এলেই টার্মিনালের চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সামান্য বৃষ্টির পরই বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যায়। পানির নিচে থাকা গর্তগুলো তখন পরিণত হয় বিপজ্জনক ফাঁদে। যাত্রীরা বাসে ওঠার সময় কাদা-পানি মাড়াতে বাধ্য হন। অনেক সময় ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা টার্মিনালে নেমে নিরাপদে মূল সড়কে যাওয়ার পথ খুঁজে পান না।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

পরিবহন শ্রমিকরা জানান, পানি জমে থাকলে বাস টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় চালকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। গর্তে চাকা আটকে গেলে যানবাহন সরাতেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। টার্মিনালের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, টার্মিনালের ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি বাস চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে বাস রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই।

স্থান সংকটের কারণে টার্মিনালের ভেতরে বাস রাখার পাশাপাশি বাইপাস সড়কের দুই পাশেও সারি করে বাস দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এতে একদিকে যেমন টার্মিনালের ভেতরে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে, অন্যদিকে সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।

প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই টার্মিনাল ব্যবহার করলেও যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা, চলাচলের পথ, পানি নিষ্কাশনসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ ব্যবহারকারীদের। টার্মিনালের বাস মালিক, শ্রমিক ও যাত্রীদের জন্য নির্মিত ভবনটির অবস্থাও ভালো নয়। দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কামাল হোসেন নামে এক রিকশা চালক বলেন, যাত্রীরা চায় এই বাসস্ট্যান্ডের কাউন্টারে যেতে, কিন্তু ভিতরে যাওয়া যায় না। ভাঙাচোরার জন্য ভিতরে যাওয়া যায় না। গেলে গাড়ি উল্টে পড়ে যায়। গাড়ির রিং বাঁকা হয়ে যায়, এখানে চলাচলের অবস্থা খুবই খারাপ।

স্থানীয় বাস চালক জয় দেব দাস বলেন, এই টার্মিনালে বাস নিয়ে ঢুকলে গাড়ি গর্তে পড়ে টায়ার পাংচারসহ নানা সমস্যা হয়। কর্তৃপক্ষ যদি একটু সুদৃষ্টি দিয়ে এই টার্মিনালটি সংস্কার করে দিত, তাহলে আমাদের সকলের জন্য ভালো হতো। আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই, শুধু টার্মিনালের পরিবেশটা ভালো করে দিলেই আমাদের ভোগান্তি কমবে।

আলী আকবর ও নুসরাত জাহান নামে দুই যাত্রী বলেন, আমরা পিরোজপুর থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করি। এই টার্মিনালের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙা, বৃষ্টি হলে পানি জমে কাদা হয়ে যায়। আমাদের চলাচলের জন্য খুবই অসুবিধা হয়, তাই জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যাতে এই টার্মিনালটি উঁচু করা হয় এবং নতুনভাবে মেরামত করা হয় যেন সাধারণ যাত্রীদের কষ্ট না হয়।

বাস কাউন্টার পরিচালক মো. চুন্নু শেখ বলেন, এখানে চাকরি করি প্রায় দীর্ঘ ১৬ বছর, গত বছর এক যাত্রী কাউন্টারে আসার সময় খাদে পড়ে পা ভেঙে গিয়েছিল, আমি নিজে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। এ বছরও দুটি অটোরিকশা উল্টে পড়ে গেছে, তাদেরকেও আমি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছি। এই দুর্ভোগ আমরা আর দেখতে চাই না।

আরেক বাস কাউন্টার পরিচালক তরিকুল ইসলাম রাজিব বলেন, বাস টার্মিনালটির বয়স অনেক বছর হয়ে গেল। টার্মিনালটি তৈরির পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো উন্নয়নমূলক কাজ হয়নি। এটা খুবই বেহাল অবস্থায় রয়েছে। এখানকার বাস মালিক ও শ্রমিকরা বাস রাখার কোনো জায়গা পাচ্ছে না। এই টার্মিনালটি বর্তমানে গ্রামের মাটির কাঁচা রাস্তার মতো অবস্থা হয়েছে। সাধারণ যাত্রীরা কাউন্টারে আসতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থায় রয়েছে টার্মিনালটি। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ বারবার সরকারকে অবগত করলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

পিরোজপুর জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, টার্মিনালের অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হয়নি। ভবনটির অবস্থাও ভালো নয়। টার্মিনালের ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিদিন দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সংস্কারের জন্য পৌরসভায় বারবার চিঠি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

পিরোজপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ধ্রুব লাল দত্ত বণিক বলেন, টার্মিনালটি প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করতে হবে। পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে টার্মিনালের বড় ধরনের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। সরকার উদ্যোগ নিলে এবং নতুন করে প্রকল্প পাওয়া গেলে টার্মিনালটির সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।