
ডেঙ্গুর প্রকোপে খুলনার চিকিৎসাব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে দেখা দিয়েছে শয্যা, রক্ত সংকট। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ রোগীর চাপ। মেঝে ও বারান্দায় চলছে চিকিৎসা। শিশু বিভাগে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি। এর মধ্যে সাত-আট মাস ধরে অচল প্লাজমা অ্যাফেরেসিস মেশিনের কারণে প্লাটিলেটের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত নতুন মশক নিধন ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। এই সংকটের নির্মম পরিণতি বহন করছে আমেনার মতো পরিবার। ডেঙ্গুতে স্বামী সুমন আলীকে হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে দিশেহারা তিনি।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা জেলায় নতুন করে ৮৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৩৯ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৪৪ জন। ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৮৩১ জন। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪১৫ জন। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩ হাজার ২৬৪ জন। আর ১৪৩ জনকে অন্যত্র রেফার করা হয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তির তথ্য নেই। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৫১ জন। হাসপাতালটির হিসাবে, ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৬৫ জন।
খুমেক হাসপাতালে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৭৭। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগী ২৬৮ জন। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। মেডিসিন ওয়ার্ডে শয্যা তো নেই-ই, মেঝেতেও হাঁটার জায়গা নেই। রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একই জায়গায় দুই-তিনজনকে থাকতে হচ্ছে।
রোগীর স্বজন তানজিনা খাতুন বলেন, বেড পাইনি। ভেতরে ছিলাম, অনেক ভিড় থাকার কারণে আবার বাইরে বের করে দিয়েছে।
আরেক স্বজন আশরাফুজ্জামান বলেন, দুই দিন ধরে হাসপাতালে থাকলেও কোনো জায়গা পাননি। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীকে শ্বাসকষ্টের মধ্যে দুই-তিনজনের সঙ্গে একই জায়গায় রাখতে হচ্ছে।
ডেঙ্গু রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, শয্যার পাশাপাশি চিকিৎসক পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। একজন স্বজন বলেন, তার দুই ডেঙ্গু রোগী দুই তলায় ভর্তি। আরেকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডাক্তারই পাই না, বেড কোন জায়গায় পাই?
শিশু বিভাগে সংকট আরও তীব্র। ৪৮ শয্যার বিপরীতে সেখানে ভর্তি ছিল ১৮৬ শিশু। নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৪০ জন। ফলে মেঝে ও বারান্দায় অতিরিক্ত বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ডেঙ্গু, হাম ও মৌসুমি রোগে খুলনা ও আশপাশের জেলা থেকে শিশু রোগীর চাপ বেড়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
শুধু খুমেক নয়, খুলনার সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও রোগীর চাপ বেড়েছে। খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা কামাল বলেন, এই মুহূর্তে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেশি। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক রোগী সিট পাচ্ছেন না।
ডেঙ্গুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রক্ত ও প্লাটিলেটের সংকট। রোগীর স্বজনদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। এক রক্তদাতা জানান, পাশের রোগীর স্বজনদের রক্তের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে দেখে শেষ পর্যন্ত নিজেই রক্ত দিয়েছেন। এক স্বেচ্ছাসেবকের ভাষ্য, স্বজনেরা কান্নাকাটি করছেন। এমনকি কোথাও কোথাও অপারেশন বন্ধ রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে খুমেকের ব্লাড ব্যাংকের প্লাজমা অ্যাফেরেসিস মেশিন নিয়ে। সাত-আট মাস ধরে কিটের অভাবে মেশিনটি বন্ধ। ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগের টেকনোলজিস্ট মো. রোকনুজ্জামান বলেন, কিট সরবরাহ না থাকায় মেশিনটি আপাতত বন্ধ আছে। কিট সরবরাহ করা হলে আবার চালু করা সম্ভব।
অ্যাফেরেসিস পদ্ধতিতে একজন ডোনারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় প্লাটিলেট সংগ্রহ করা যায়। কিন্তু মেশিন বন্ধ থাকায় এখন কয়েকজন, এমনকি চারজন ডোনারের কাছ থেকে প্লাটিলেট সংগ্রহ করতে হচ্ছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্লাটিলেট কমে গেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে। সাধারণত কয়েকজন, এমনকি চারজন ডোনারের কাছ থেকে সংগ্রহ করে প্লাটিলেট দেওয়া হয়।
সরকারি ব্যবস্থায় অ্যাফেরেসিসে খরচ প্রায় আড়াই হাজার টাকা। বেসরকারিতে খরচ প্রায় ১৮ হাজার টাকা। ফলে সরকারি মেশিন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় রোগীর স্বজনদের অতিরিক্ত আর্থিক চাপও বহন করতে হচ্ছে।
ডেঙ্গু পরীক্ষায় দীর্ঘ অপেক্ষার সুযোগ নিয়ে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালেরা রোগীদের বেসরকারি প্যাথলজিতে পাঠাচ্ছেন—এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্বজন।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থেকে আসা রোগীর স্বজন হাসান আলী বলেন, হাসপাতালে সিবিসি পরীক্ষা করাতে গিয়ে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়েও সিরিয়াল পাননি। প্লাটিলেট আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে দালালদের কথায় বাইরের একটি প্যাথলজিতে যান। সেখানে একই রক্ত পরীক্ষার জন্য ৮০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। অথচ সরকারি হাসপাতালে এ পরীক্ষায় খরচ হওয়ার কথা ৫০ থেকে ১০০ টাকা।
সাতক্ষীরা থেকে খুমেকে ভর্তি হালিমা বেগমের অভিযোগ, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে এমন পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে, যা নির্দিষ্ট বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়া করা যাচ্ছে না। অন্য প্যাথলজির রিপোর্ট গ্রহণে গড়িমসির অভিযোগও করেন তিনি। তার ভাষ্য, দিনে দুই-তিনবার প্লাটিলেট পরীক্ষা করাতে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা চলে যাচ্ছে।
কিছু চিকিৎসক, ক্লিনিক ও প্যাথলজির মধ্যে কমিশনভিত্তিক যোগাযোগ এবং সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ১১ থেকে ১২টি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডকে রেড জোন ঘোষণা করেছে। মশক নিধনে রয়েছে প্রায় ৫৭টি ফগার মেশিন। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫৫ জন শ্রমিক লার্ভা নিধনে কাজ করছেন। নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে ফগিংয়ের পাশাপাশি ওয়াসার ম্যানহোলে লাইট ডিজেল অয়েল বা কালো তেল ছিটানো হচ্ছে।
কেসিসি তিন হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড ও দুই হাজার লিটার লার্ভিসাইড কিনেছে। কিন্তু নতুন লার্ভিসাইডের পরীক্ষায় ৪৮ ঘণ্টা পরও ১৫ শতাংশ লার্ভা মারা যায়নি। ১২ সেপ্টেম্বর কীটতত্ত্ববিদ, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সামনে এ পরীক্ষা করা হয়। নমুনা তিনটি পরীক্ষাগারেও পাঠানো হয়েছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার ফল দেখে কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু ওই চালান ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। তিনি কীটতত্ত্ববিদদের সহযোগিতায় দ্রুত কার্যকর ওষুধ কেনার নির্দেশ দিয়েছেন।
নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় হাসপাতালে শয্যা, রক্ত ও প্লাটিলেটের সংকট এবং প্লাটিলেট সংগ্রহের অ্যাফেরেসিস মেশিন মাসের পর মাস অচল থাকা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। একজন ডোনারের কাছ থেকে প্লাটিলেট সংগ্রহের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কিটের অভাবে মেশিন বন্ধ থাকায় রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একইভাবে মশক নিধনের ওষুধ কার্যকর কি না, তা নিশ্চিত করে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে আমেনার পরিবারে। ডেঙ্গুতে স্বামী সুমন আলীকে হারিয়ে অল্প বয়সেই বিধবা হয়েছেন আমেনা। এখন তিন সন্তান নিয়ে দিশেহারা তিনি। তার সংসারে রয়েছে সাত মাস বয়সি একটি মেয়ে এবং সাত বছর বয়সি আরেক মেয়ে। স্বামীর মৃত্যুতে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তিনি।
খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. শওকত আলী বলেন, জেলার প্রতিটি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে অন্তত পাঁচটি করে শয্যার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালে বর্তমানে কোনো ওষুধের সংকট নেই। পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ মজুত রয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় করোনা মহামারির সময় রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত গ্রিন, ইয়েলো ও রেড জোনকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।



