‘বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পাই’

‘বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পাই। ভেবেছিলাম পটকা ফুটছে। এর কিছুক্ষণ পরেই শুনি আমার স্বামীকে গুলি করা হয়েছে। আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সে মাটিতে পড়ে আছে।’ স্বামীর নিথর দেহের পাশে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় একটি চায়ের দোকানের সামনে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহত আলিফ ফকির কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের ডিটপুর গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দুর্গাপুরের তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছিলেন।
জানা গেছে, আলিফ বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল ‘রূপসী বাংলার’ নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে স্থানীয় বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সংবাদ ও ভিডিও প্রকাশ করতেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ৮টার দিকে তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে চা পান করেন লুৎফুজ্জামান। দোকান থেকে বের হয়ে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের দিকে যাওয়ার সময় বুঝতে পারেন মোবাইল ফোনটি দোকানে ফেলে এসেছেন। ৩-৪ মিনিটের মধ্যে তিনি আবার দোকানে ফিরে আসেন। ফোনটি নিয়ে বের হওয়ার মুহূর্তে ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সি দুই যুবক দোকানে এসে সিগারেট চান। এর পরপরই আলিফ ফকিরকে লক্ষ্য করে কয়েকটি গুলি চালানো হয়।
ঘটনার রাতে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে আলিফ ফকির বলেছিলেন, ‘বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ দেড় বছরের শিশুপুত্র আইয়ান সাফয়ানকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে বের হওয়া সেই কথাই যে জীবনের শেষ কথা হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি আনন্দিতা।
স্বামীর নিথর দেহের পাশে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আনন্দিতা সাংমা বলেন, ‘বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পাই। ভেবেছিলাম পটকা ফুটছে। এর কিছুক্ষণ পরেই শুনি আমার স্বামীকে গুলি করা হয়েছে। আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সে মাটিতে পড়ে আছে। আশেপাশের লোকজনের সহায়তায় হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি তো আর তাকে ফিরে পাব না। কিন্তু যারা আমার দুটি অবুঝ শিশুকে পিতৃহারা করল, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
দোকানি রবিন রাংসা বলেন, আমি চায়ের কাপ ধুচ্ছিলাম। আলিফ ফকির ফোন নিতে ফিরে এলে দুজন যুবক এসে সিগারেট চায় এবং পরপর পাঁচটি গুলি করে। ভয়ে আমি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ি। ঘাতকদের একজন লুঙ্গি ও অন্যজন থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরা ছিল।
তিনি আরও বলেন, গুলির শব্দে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর পরই নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন এবং দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খানসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করেছে।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, পরিবারের কেউ এখনও লিখিত অভিযোগ দেয়নি। হত্যায় জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পুরো জেলায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে সাংবাদিকতার সুবাদে অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে সোচ্চার থাকায় লুৎফুজ্জামান আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন। গত বছরের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেছিল।
