ঈদ এলেই চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন এই ২১ প্রবীণ

স্বজনের অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা ২১ প্রবীণের জন্য আবারও আসছে এক বর্ণহীন ঈদ। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার জোয়ানপুর গ্রামে অবস্থিত সোনাভান বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে বসবাস করা এই মানুষগুলোর জীবনে উৎসব মানেই স্মৃতির ভার আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস। কেউ একসময় ছিলেন সচ্ছল, কেউ সংসারের কেন্দ্রবিন্দু, আবার কেউ কখনও পূর্ণ সংসারের স্বাদই পাননি। এখন তাদের সবার ঠিকানা একটাই এই আশ্রম।
গাইবান্ধার সবুরা বেগম দীর্ঘদিন ধরে একাকিত্ব আর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছেন। ১৯৮১ সাল থেকেই স্বামী থাকা সত্ত্বেও তিনি একা। নেই কোনো সন্তান বা স্বজনের সান্নিধ্য। ঢাকায় কাটানো জীবন ছেড়ে ছয় বছর আগে আশ্রয় নিয়েছেন এই কেন্দ্রে। চোখে-মুখে ভেসে ওঠে না বলা কষ্ট।
তিনি বলেন, আমার তো কেউ নাই। ঈদ আসলে মনে পড়ে, যদি একটা আপন মানুষ থাকত, একটু পাশে বসত, একটু কথা বলত।
বগুড়া শহরের মালগ্রামের ৭৫ বছর বয়সি মহিদুল ইসলাম একসময় ঠিকাদারি করে ভালোই সংসার চালিয়েছেন। পাঁচ বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর জীবন বদলে যায়। তিন মেয়ে থাকলেও কেউ নিয়মিত দেখাশোনা করতে পারেননি। নিজের বাড়ি ছেড়ে এখন এই আশ্রমেই তার দিন কাটে।
তিনি বলেন, সব ছিল একসময়। এখন কিছুই নাই। মেয়েরা আছে, কিন্তু তাদেরও সংসার। ঈদের সময় খুব খারাপ লাগে, বাড়ির কথা মনে পড়ে।
সারিয়াকান্দির প্রায় শতবর্ষী বাদশা প্রামাণিকের জীবনও একাকিত্বে ভরা। দুই ছেলে ও এক মেয়ে থাকলেও বার্ধক্যের ভারে একসময় পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নেন এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
তিনি বলেন, ছেলেমেয়ে আছে, কিন্তু কাছে নাই। বয়স হইলে মানুষরে আর কেউ চায় না। এখানে থাকি, আল্লাহ যেমন রাখে।
এমন গল্পই ছড়িয়ে আছে এই কেন্দ্রের ২১ জন প্রবীণের জীবনে ১৪ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ। কেউ আছেন আট বছর ধরে, কেউবা মাত্র কয়েক বছর। ঈদ এলেই তাদের মন ছুটে যায় পুরোনো দিনগুলোর দিকে সন্তান, নাতি-নাতনিদের হাসি, পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দমুখর সময়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেকের স্বজনই খোঁজ নেন না, আবার কারও কারো স্বজন থাকলেও নেই কোনো যোগাযোগ। ফলে আশ্রমের বাসিন্দারাই এখন একে অপরের পরিবার; হাসি-কান্না, গল্প আর স্মৃতিচারণেই কেটে যায় দিন।
ঈদের দিনটিও তাই তাদের কাছে খুব সাদামাটা। সকালে সেমাই, পায়েস, খিচুড়ি, ডিম আর দুপুরে বিরিয়ানি বা মাংসের আয়োজন থাকলেও অনুপস্থিত থাকে প্রিয়জনের সান্নিধ্য। তবুও একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা এসবেই তারা খুঁজে নেন ছোট ছোট আনন্দ।
২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মজিদ খান তার মায়ের নামে এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন এবং প্রবাসে থেকেও এর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এখানে বসবাসকারী প্রবীণদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা সেবাও নিশ্চিত করা হচ্ছে।
উপসহকারী মেডিকেল কর্মকর্তা বিজন কুমার পাল বলেন, এখানে যারা আছেন, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে অবহেলার শিকার। আমরা চেষ্টা করি তাদের যত্ন নেওয়ার, চিকিৎসা দেওয়ার এবং মানসিকভাবে ভালো রাখার।
মাঝে মাঝে কেউ কেউ স্বজনের দেখা পেলেও বেশিরভাগের জন্য সেই অপেক্ষা থেকে যায় অপূর্ণ। তবে সমাজের সহৃদয় মানুষজন এগিয়ে আসেন, সহযোগিতার হাত বাড়ান, যাতে অন্তত উৎসবের দিনে খাবারের অভাব না হয়। তবুও যত আয়োজনই থাকুক, স্বজনের অভাবে তাদের ঈদ থেকে যায় বর্ণহীন, নিঃসঙ্গ আর অপেক্ষায় ভরা।