‘স্থপতি নেই’ অজুহাতে বন্ধ ভবন নকশা অনুমোদন

স্থপতির প্রতিনিধি না পাওয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে বান্দরবান পৌরসভা এলাকায় ভবনের নকশা অনুমোদন কার্যক্রম। এতে একদিকে বৈধভাবে ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন নাগরিকেরা, অন্যদিকে অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণের প্রবণতা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি ভবনের নিরাপত্তা ও পৌরসভার রাজস্ব আদায়ও ব্যাহত হতে পারে।
সরেজমিনে বান্দরবান পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, ২০২৪ সালের পর থেকে নকশা অনুমোদন কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় কোথাও কোথাও পৌরসভার অনুমোদন ছাড়াই নতুন ভবন ও বহুতল স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। এসব ভবনের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, উচ্চতা, রাস্তা থেকে নির্ধারিত দূরত্ব, পাশের স্থাপনার সঙ্গে প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা এবং অন্যান্য কারিগরি শর্ত মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত নকশা অনুমোদনের সুযোগ না থাকায় বৈধভাবে ভবন নির্মাণ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে স্থাপনাগুলোর বৈধতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিক বলেন, ‘পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরে নকশা অনুমোদন বন্ধ থাকায় পৌরবাসী অনেক কষ্টের মধ্যে পড়েছেন। কেউ বৈধভাবে ভবন নির্মাণ করতে চাইলে অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার ও পৌরসভাও নকশা অনুমোদন থেকে যে রাজস্ব পেত, সেটি হারাচ্ছে।’
আরেক বাসিন্দা শাহাদত বলেন, ‘নকশা অনুমোদন বন্ধ থাকায় মানুষ অনেক ক্ষেত্রে নিজের মতো করে ভবন নির্মাণ করছে। পরিকল্পনা ছাড়া এভাবে ভবন নির্মাণ করা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শহরের রাস্তা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও ভবনের নিরাপত্তার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখা জরুরি।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও সীমিত জায়গার কারণে বান্দরবান শহরে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও কারিগরি যাচাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নকশা অনুমোদন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে নিয়ম মেনে নির্মাণ করতে আগ্রহী ব্যক্তিরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের সুযোগও বাড়তে পারে।
নকশা অনুমোদন বন্ধ কেন
নকশা অনুমোদন কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, নকশা অনুমোদন কমিটি গঠনের জন্য পৌরসভার পক্ষ থেকে কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টসের একজন প্রতিনিধি না পাওয়ায় কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। শিগগিরই ১৫ সদস্যের কমিটি গঠন করে নকশা অনুমোদন কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৫ সদস্যের কমিটি গঠনের উদ্যোগ
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, নকশা অনুমোদন কার্যক্রম চালু করতে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, কমিটিতে পৌরসভার মেয়র অথবা সরকার মনোনীত প্রশাসক সভাপতি এবং পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী অথবা সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত কর্মকর্তা সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অথবা তার মনোনীত প্রতিনিধি, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) প্রতিনিধি এবং ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইইবি) মনোনীত প্রকৌশলীকে কমিটিতে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) প্রতিনিধি বা নগর পরিকল্পনাবিদ, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) প্রতিনিধি, স্থানীয় কোনো কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, অভিজ্ঞ পেশাজীবী, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, পৌর কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে একজন এবং সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধিকে রাখার কথাও বলা হয়েছে।
তবে কমিটির চূড়ান্ত গঠন, সদস্যদের মনোনয়ন এবং অনুমোদন কার্যক্রম চালুর নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।
রাজস্ব আদায় নিয়ে প্রশ্ন
নকশা অনুমোদন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পৌরসভার সম্ভাব্য রাজস্ব আদায় ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ভবনের নকশা অনুমোদন ও যাচাইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফি থেকে আয় করার সুযোগ থাকলেও কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সেগুলোর বৈধতা, জরিমানা, নকশা সংশোধন কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে দ্রুত নকশা অনুমোদন কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবনগুলো নিয়ম মেনে তৈরি হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে উদ্বেগ
পর্যটননির্ভর গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহর বান্দরবানে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিকল্পিত নগরায়ণ জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, সীমিত জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সড়ক, ড্রেনেজ, অগ্নিনিরাপত্তা, যান চলাচল ও জরুরি সেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, নকশা অনুমোদন কার্যক্রম দ্রুত চালু করার পাশাপাশি অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণের বিষয়েও পৌর কর্তৃপক্ষকে নজরদারি বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা আবেদনগুলো নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও নিতে হবে।


