logo

ক্ষমতাসীনদের দখলে সিলেটের সব পশুর হাট

ক্ষমতাসীনদের দখলে সিলেটের সব পশুর হাট
ছবি: সংগৃহীত

সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) স্থায়ী ও অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। দলের একাধিক নেতাকর্মী টেন্ডার কিনলেও শেষমেষ সমঝোতার মাধ্যমে পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন তারা। একক ব্যক্তির নামে ইজারা হলেও ভাগ পাবেন সবাই।

এবার সিলেট নগরে অস্থায়ী পশুর হাটও কমেছে, মাত্র পাঁচটি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়েছে। গত বছর সিটি এলাকায় ৯টি হাট বসেছিল। ফলে সিটি করপোরেশনের রাজস্বও কমেছে। যদিও স্থায়ী পশুর হাট কাজিরবাজার সিটি করপোরেশন মালিকানা বুঝে পাওয়ায় সেখান থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় হবে বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন।

সিলেট নগরের সবচেয়ে বড় হাট কাজিরবাজার ওয়াকফ এস্টেটের সম্পত্তি। এতদিন এটি আফছর উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির মালিকানায় ছিল। সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে বাজারটি সিটি করপোরেশন বুঝে পায়। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. কাইয়ুম চৌধুরী চলতি মাসের শুরুর দিকে মালিকানা বুঝে নিয়ে নতুন করে ইজারা দেন।

প্রথমবারই এক বছরের জন্য কাজিরবাজার পশুর হাট দুই কোটি ৬১ লাখ টাকায় ইজারা নেন সিলেট মহানগর বিএনপির সহসভাপতি মাহবুব কাদির শাহী ও কয়েকজন নেতা। ভ্যাট-ট্যাক্সসহ তিন কোটি ৪০ লাখ টাকায় ইজরা মূল্য পাবে সিটি করপোরেশন।

গত ১১ মে সিলেট সিটি করপোরেশন অস্থায়ী পাঁচটি কোরবানির পশুর হাট ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সিসিক সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ সুরমা কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনাল-সংলগ্ন ফাঁকা মাঠ, নতুন টুকেরবাজার তেমুখী-সংলগ্ন খালি জায়গা, শহরতলীর মিরাপাড়ায় আব্দুল লতিফ প্রাথমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন খালি মাঠ, শাহপরান বাজার-সংলগ্ন খালি জায়গা ও সিসিকের মালিকানাধীন তেতলীর এসফল্ট মাঠ অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য ইজারা আহ্বান করা হয়।

১৩ ও ১৪ মে সিডিউল সংগ্রহ এবং ১৭ মে সকাল ১০টা থেকে দুপুর দেড়টার মধ্যে দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা ছিল। যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ মে থেকে ইজারা চূড়ান্ত করা হয়।

ইজারা দেওয়া হাটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে ইজারা হয়েছে শাহপরাণ (রহ.) বাজার-সংলগ্ন খালি জায়গার পশুর হাট। গত বছর ৮০ হাজার টাকায় ইজারা হওয়া এই হাট এবার ১১ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ টাকায় নেন বিএনপি নেতা এনামুল হক কুটি। দলের একাধিক নেতাকর্মী সমন্বয় করে এনামুল হকের নামে হাটটি ইজারা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

দক্ষিণ সুরমার কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনাল হাট এক লাখ টাকায় ইজারা নেন মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার সঙ্গে বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতা যুক্ত হয়ে বাজার ইজারা নিয়েছেন। বাজারটির গত বছর ইজারা মূল্য ছিল প্রায় চার লাখ টাকা। এ বছর পরিচ্ছন্নতা বাবদ দেড় লাখ টাকা, সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১০ শতাংশ আয়কর যোগ হয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

নগরের তেমুখী এলাকার পশুর হাট এক লাখ ২০ হাজার টাকায় মোরাদ হোসেনের নামে ইজারা নেন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা উসমান হারুন পনিরসহ যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন সাবেক নেতা। গত বছরের মতো এবারও প্রায় একই মূল্যে ইজারা হলেও পরিচ্ছন্নতা খাতে দেড় লাখ টাকা যোগ হওয়ায় ভ্যাট-ট্যাক্সসহ মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা।

নতুন যুক্ত হওয়া দক্ষিণ সুরমার তেতলি এলাকার এসফল্ট মাঠের হাট ৫০ হাজার টাকায় ইজারা নেন জেলা যুবদলের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক মকছুদুল করিম নুহেল। পরিচ্ছন্নতা ব্যয়, করসহ এ হাটের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা।

মিরাপাড়ার আব্দুল লতিফ প্রাথমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন খালি জায়গার হাট মাত্র ৩০ হাজার টাকায় ইজারা পান কামরুল হাসান। শিবগঞ্জ ও টিলাগড় বিএনপির কয়েকজন নেতা যুক্ত হয়ে কামরুলের নামে বাজারটি ইজারা নেন।

তবে, এই বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের বাজার পরিদর্শক আলবাব আহমদ জানিয়েছেন, দরপত্র আহ্বান করে সর্বোচ্চ মূল্য পাওয়া ব্যক্তিকে এবার ইজারা দেওয়া হয়েছে। কে কোন দলের নেতা বা কর্মী তা আমাদের জানা নেই।

এবার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে মাছিমপুর কয়েদির মাঠ ও টিলাগড় পয়েন্ট এলাকার হাট। গত বছর শুধু মাছিমপুর হাট থেকেই ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ইজারা পাওয়া গিয়েছিল। এবার পাঁচটি হাট থেকে মোট ইজারা মূল্য ১৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা এবং সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা। গত বছর সাতটি হাট থেকে মোট রাজস্ব ছিল প্রায় ৫৬ লাখ টাকা।

ইজারা প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক নিলামের বদলে সমঝোতার মাধ্যমে আগে থেকেই ইজারাদার নির্ধারণ করা হয়েছে। উন্মুক্ত নিলাম হলে সিসিক আরও বেশি রাজস্ব পেত। এখানে রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেট কাজ করেছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিসিক প্রশাসক মো. আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেন, সব নিয়মকানুন মেনেই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। শহরজুড়ে হাট থাকলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। নগরজুড়ে যানজটও বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, হাটের সংখ্যা কম হলেও রাজস্ব কমেনি। স্থায়ী কাজিরবাজার পশুর হাট থেকে এবার প্রথমবারের মতো তিন কোটি ৪০ লাখ টাকা রাজস্ব এসেছে। সব মিলিয়ে সিসিক লাভবান হয়েছে।