
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় দুই লাখ হেক্টর এলাকা নিয়ে কৃষিভিত্তিক গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ (জি-কে) প্রকল্প পূর্ণ সক্ষমতা হারিয়েছে। চাহিদা পূরণ করতে না পারায় ধাক্কা লেগেছে এই অঞ্চলের কৃষি খাতে। বিকল্প ব্যবস্থাপনার দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে চাষিদের। ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে উৎপাদন খরচ। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একসময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলার কৃষির প্রাণ ছিল জি-কে সেচ প্রকল্প। পদ্মা থেকে পানি উত্তোলন করে জেলাগুলোর ১৩ উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে পৌঁছে দিত তিনটি প্রধান পাম্প। এখন সেই তিন পাম্পের দুটি অচল। একটি পাম্পের ওপর নির্ভর করে চলছে বিশাল এই সেচব্যবস্থা। সংকট কাটাতে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিলেও মাঠে কাটেনি দুরবস্থা।
পাম্প স্টেশন হাউসের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, কিছু দিন আগে জার্মানি থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে পাম্পগুলো মেরামত করা হয়েছে।
তবে সরেজমিন তার দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মার তীরে অবস্থিত পাম্প হাউস ঘুরে দেখা যায়, পুরোনো অবকাঠামোর ছাপ স্পষ্ট। সেচনালার বিভিন্ন অংশে পলি ও ময়লা জমে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাম্প হাউসের যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশে পুরোনো ও ব্যবহারের চিহ্ন রয়েছে। একটি পাম্প সচল থাকলেও বাকিগুলো অচল থাকায় পুরো প্রকল্পের সেচব্যবস্থা সীমিত সক্ষমতায় চলছে।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা–দীর্ঘদিন সেচব্যবস্থা দুর্বল থাকলে কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে; যা পরিবেশের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে খাল ও সেচনালা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের সহসভাপতি পরিবেশবিদ শাহাবউদ্দিন মিলন বলেন, জিকে সেচ প্রকল্প শুধু কৃষির জন্য নয়, এ অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রকল্পটির সংকট কাটানোর পাশাপাশি কাজের মান, পরিবেশগত প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
পূর্ণ সক্ষমতায় কী লাভ
১৯৫১ সালে প্রাথমিক জরিপের পর ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জিকে সেচ প্রকল্প অনুমোদন দেয়। ১৯৫৪-৫৫ অর্থবছরে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই প্রকল্পে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় পদ্মা নদী থেকে পানি তুলে প্রধান ও সংযোগ খালের মাধ্যমে চার জেলার কৃষিজমিতে সরবরাহ করা হয়। তিনটি প্রধান সেচ পাম্পের আওতাধীন এলাকা এক লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর। সেচযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৫ হাজার ৫০ হেক্টর। পলি জমে তা কমে প্রায় ৫৫ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। দুটি অচল থাকায় একটি পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে পুরো সেচব্যবস্থাকে। সচল থাকা পাম্পটির সক্ষমতা এক হাজার ৩০০ কিউসেক।
কৃষকদের মতে, চার জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমির চাহিদার তুলনায় একটি পাম্প দিয়ে পানি সরবরাহ কতটা পর্যাপ্ত–সে হিসাব জরুরি। কোন এলাকায় কত কিউসেক পানি পৌঁছাচ্ছে, কোথায় পানি পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে এবং কত জমি বর্তমানে পর্যাপ্ত সেচের বাইরে রয়েছে, সেই মাঠপর্যায়ের তথ্য প্রকল্পটির প্রকৃত সক্ষমতা ও সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট করবে।
তারা বলছেন, গভীর নলকূপসহ বিকল্প ব্যবস্থায় সেচ দিতে হচ্ছে। এতে ডিজেল, বিদ্যুৎ ও শ্রমের খরচ বাড়ছে। সময়মতো পানি না পেলে আবাদ পিছিয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত খরচেও কমছে লাভ। ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মায় পানির স্তর কমে যাওয়ার পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে সেচ কার্যক্রমে সংকট আরও প্রকট হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো পাম্প ও সেচ অবকাঠামোর দুরবস্থা।
ভেড়ামারার কৃষক আসাদুল ইসলাম বলেন, একটা পাম্প দিয়ে সব এলাকায় ঠিকমতো পানি দেওয়া সম্ভব হয় না। আমাদের এলাকায় পানি পৌঁছাতে দেরি হয়, আবার অনেক সময় প্রয়োজনের সময় পানি পাওয়া যায় না। এতে ফসলের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি বাড়তি টাকা খরচ করে সেচ দিতে হচ্ছে। পাম্পগুলো দ্রুত সচল করা গেলে কৃষকের অনেক উপকার হবে।
আরেক কৃষক নাজমুল হোসেন বলেন, সেচের পানি ঠিকমতো না পাওয়ায় আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। সময়মতো পানি না পেলে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ ব্যাহত হয়। তখন বাধ্য হয়ে শ্যালো বা গভীর নলকূপের পানি দিয়ে জমিতে সেচ দিতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। সরকার বড় প্রকল্প নিচ্ছে, কিন্তু আমরা চাই দ্রুত কাজ শেষ করে পর্যাপ্ত সেচের ব্যবস্থা করা হোক।

অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ
প্রকল্প সূত্র বলছে, প্রধান তিনটি পাম্পের মধ্যে দু্ই নম্বর পাম্পটি ২০২১ সালের ২১ মে থেকে সম্পূর্ণ অচল। তিন নম্বর পাম্পটি প্রায় পাঁচ মাস ধরে বন্ধ। এর আগেও তিন নম্বর পাম্পটি অচল হয়ে গেলে সেটি সচল করতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হয়।
২০১৭ সালে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে তিন নম্বর পাম্পটি অচল হওয়ার পর জাপানি প্রতিষ্ঠান ইবারা ১৭ কোটি টাকায় মেরামতের প্রস্তাব দিয়েছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বিটাকের মাধ্যমে অটোকন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তিন কোটি ৭১ লাখ টাকার চুক্তিতে পাম্পটি মেরামত করা হয়। ২০২১ সালে সেটি ফের সচল হয়। কয়েক বছরের ব্যবধানে পাম্পটির কার্যকারিতা নিয়ে আবার সংকট তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে তিনটি প্রধান পাম্প হাউস পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় পুনরুজ্জীবিত করতে ২০২৫ সালেল ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার ‘জিকে সেচ প্রকল্পের জরুরি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী–প্রধান দুটি পাম্প পুনর্বাসনে ৪১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সাবসিডিয়ারি পাম্প হাউস নির্মাণে ১০৯ কোটি, পাম্প-মোটরসেট সরবরাহ ও স্থাপনে ২৫৫ কোটি ৬৯ লাখ, সংযোগ খাল পুনঃখনন ও লাইনিংয়ে ৩০ কোটি ৩৭ লাখ, সংযোগ সড়ক নির্মাণে ১৫ কোটি ৬০ লাখ এবং বৈদ্যুতিক পুনর্বাসনে ৩৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় প্রায় দুই কোটি, সেচখাল সংশ্লিষ্ট পূর্তকাজে ২৭৭ কোটি ৩৯ লাখ এবং অবকাঠামো মেরামতে ১৩৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রকল্প অনুমোদনের নয় মাস পার হলেও প্রধান দুটি পাম্প পুনর্বাসনের টেন্ডার হয়নি। আহ্বান করা যায়নি আন্তর্জাতিক দরপত্র। সচল করার উদ্যোগ প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে আছে। যদিও পনি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে একটি নতুন পাম্প চালু করা সম্ভব হবে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, এই প্রক্রিয়টি তিন ধাপে সম্পন্ন করতে হয়। অন্য সাধারণ টেন্ডার বা দরপত্র আহ্বানের মতো না। একটু সময় লাগবে।
তিনি বলেন, প্রধান দুটি পাম্প পুনস্থাপনের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বর্তমানে পরামর্শক নিয়োগের কাজ চলছে। তিন মাস সময় লাগতে পারে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। আমাদের প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে একটি নতুন পাম্প চালু করার ইচ্ছা আছে।

অতীত নিয়ে প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা
স্থানীয়রা বলছেন, তিন নম্বর প্রধান পাম্পটি ২০২১ সালে সচল করা হলেও কয়েক বছরের ব্যবধানে অচল হয়ে পড়েছে। ফলে মেরামতকাজের ফলাফল ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মেরামতের সময় কোন কোন যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হয়েছিল, সেগুলোর স্থায়িত্ব কত ছিল, কাজের পর পাম্প কত দিন কার্যকর ছিল এবং রক্ষণাবেক্ষণে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল–এসব বিষয় নতুন প্রকল্পের নকশা ও প্রাক্কলনে কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর পাম্পগুলো দীর্ঘমেয়াদে সচল রাখার নিশ্চয়তা কী, সেটিও বড় প্রশ্ন।
তারা বলছেন, সাত দশকের পুরোনো সেচ প্রকল্পের পুনরুজ্জীবনে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফাঁদে পড়ে যেন উদ্যোগ থমকে না যায়। দ্রুত টেন্ডার শেষ করে কাজ শুরু হলে জিকে সেচ প্রকল্প আবারও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষির প্রাণভোমরা হয়ে উঠবে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মজিবুল শেখ বলেন, জি-কে সেচ প্রকল্পের পাম্পগুলো সচল রাখতে অতীতেও অর্থ ব্যয় হয়েছে। এখন আবার মূল দুই পাম্পের জন্য ৪১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রকল্পে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলে হবে না, আগের মেরামতকাজ কেন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কোথায় ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা যাতে না হয়, তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। এত বড় সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কাজের মান, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষি সংগঠক নাফিজ আহমেদ খান টিটু বলেন, পানির সংকটে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং উৎপাদন কমছে। এর প্রভাব খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে। তাই দরপত্র প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে কাজ শুরুর পাশাপাশি নতুন পাম্প চালু না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সময়ে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সার্বিক বিষয়ে কুষ্টিয়া-২ (ভেড়ামারা ও মিরপুর উপজেলা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর বলেন, পাম্পগুলো দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকলে একাধিক মৌসুমের কৃষি উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়ে। বোরো ও আমন মৌসুমে পর্যাপ্ত সেচ নিশ্চিত না হলে কৃষকদের ব্যয় বেড়ে যায়। তিনি বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলে ধরে প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন বলে জানান।


