দালালের নতুন কৌশল/ইমেইল আইডিতে গোপন সংকেত থাকলে অল্প সময়েই মেলে পাসপোর্ট

নিয়ম মেনে আবেদন করেও যেখানে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে পাসপোর্টের কাজ। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে একটি রহস্যময় ‘ইমেইল সংকেত’, যা আবেদনপত্রে লেখা থাকলেই সংশ্লিষ্ট ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস। প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা মাদারীপুরের মানুষের জন্যও এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্র হলো মাদারীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে জমেছে অসন্তোষ, অভিযোগ ও হতাশার গল্প।
মাদারীপুর পৌরসভার ১২৩ নম্বর কুকরাইল মৌজার ২৫ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০ সালে। জেলার ক্রমবর্ধমান প্রবাসী জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অফিসটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য টিনশেড দোকান। কম্পিউটার, প্রিন্টার ও ফটোকপি মেশিনে সজ্জিত এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই স্থানীয়দের ভাষ্যমতে দালালচক্রের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে।

অফিসে প্রবেশের আগেই আবেদনকারীদের ঘিরে ধরেন দালালরা। কেউ কাগজপত্রে সমস্যা আছে বলে ভয় দেখান, কেউ আবার আবেদন প্রক্রিয়াকে জটিল বলে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন। বিনিময়ে দাবি করা হয় অতিরিক্ত অর্থ।
‘ইমেইল সংকেত’ দেখলেই দ্রুত সেবা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাসপোর্ট গ্রাহক বলেন, তিনি একজন দালালের মাধ্যমে আবেদন করেছিলেন। তার ভাষ্য, আবেদনপত্রের নিচে তার নাম ও কিছু সংখ্যা ব্যবহার করে একটি বিশেষ ইমেইল আইডি লিখে দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘দালাল বলেছিল এটা লিখে দিলে কোনো সমস্যা হবে না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমি পাসপোর্ট পেয়ে যাই। এমনকি যেসব কাগজপত্র নিয়ে অন্যদের ঘুরতে দেখা যায়, সেগুলোর অনেক কিছুই আমার লাগেনি।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই বিশেষ ইমেইল বা সাংকেতিক চিহ্নই হয়ে উঠেছে দালালদের ‘পাসওয়ার্ড’। আবেদনপত্রে সেটি থাকলে সংশ্লিষ্ট ফাইল দ্রুত অগ্রাধিকার পায়।
এ বি সাত্তার বেপারী নামে একজন বলেন, দালাল আমার কাগজপত্র নিয়ে আবেদনপত্রে তাদের একটা ইমেইল আইডি ব্যবহার করছে সেটা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ হয়ে গেছে।
সরেজমিনে বেশ কয়েকজন আবেদনকারীর আবেদনপত্রে দেখা গেছে এমন রহস্যময় ইমেইল আইডি।
একই কাগজ তিনবার জমা, তবু কাজ হয়নি
রাজারচর পখিরা এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ফরাজী বলেন, তিনি নিয়ম অনুযায়ী সব কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু বারবার তাকে বলা হয় কাগজপত্রে সমস্যা রয়েছে।
তিনি বলেন, একই কাগজ তিনবার জমা দিয়েছি। কোনো সমাধান হয়নি। পরে দালালের কাছে যাওয়ার পর দেখা গেল সেই কাগজ আর লাগছেই না। আবেদনের নিচে কী যেন লিখে দিল, তারপর সব কাজ হয়ে গেল।
তার প্রশ্ন, যে কাগজ ছাড়া আগে কাজ হচ্ছিল না, দালালের মাধ্যমে গেলে সেটি ছাড়াই কীভাবে সম্ভব হলো?
‘আমাদের ছাড়া পাসপোর্ট হবে না’
হোগলপাতিয়া এলাকার ইব্রাহীম সরদার বলেন, পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার আগেই এক ব্যক্তি তাকে আটকে কথা বলেন। ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের মাধ্যমে আবেদন না করলে পাসপোর্ট হবে না। আমরা কাগজপত্র জমা দিলে কাজ হবে, না দিলে হবে না।’
তার অভিযোগ, পাসপোর্টের সরকারি ফি ছাড়াও তার কাছ থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।
‘আমরা শুধু লোক ধরার কাজ করি, টাকা অনেক জায়গায় ভাগ হয়’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দালাল দাবি করেন, প্রতি পাসপোর্টে তাদের হাতে থাকে মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। বাকি টাকা বিভিন্ন কর্মকর্তাকে দিতে হয় বলে দাবি করেন তারা।
এক দালাল বলেন, ‘আমরা শুধু লোক ধরার কাজ করি, টাকা অনেক জায়গায় ভাগ হয়। দিনে এক থেকে দুই হাজার টাকা আয় করা যায়।’
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন সরকার বলেন, মাদারীপুরে বিদেশগামী ও প্রবাসী মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সারা বছরই পাসপোর্ট অফিসে ভিড় থাকে। এই সুযোগে দালালচক্র একটি অলিখিত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেন সবুজ নামের আরেক আবেদনকারী। তিনি বলেন, দালাল ছাড়া কাজ করতে গেলে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। আমরা এ অবস্থা থেকে মুক্তি চাই।
কী বলছে কর্তৃপক্ষ?
মাদারীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. হেলাল উদ্দিন অভিযোগের বিষয়ে বলেন, কোনো দালাল যদি অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকে, তাহলে লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা বিষয়টি তদন্ত করব।
আবেদনপত্রে বিশেষ ইমেইল বা সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো বিষয় আমার জানা নেই। অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ থাকলে তা দেখানো হোক, আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

