
গাইবান্ধায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে দাদন ও চড়া সুদের ব্যবসা। একসময় যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরাত, সুদের কারবার চালিয়ে তারা আজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন আলিশান প্রাসাদ। ফাঁকা চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের। সুদের টাকা আদায়ে গড়ে তোলা হয়েছে নিজস্ব বাহিনী, চলছে শারীরিক নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার ভয়ভীতি। এক সময়ের অভাবগ্রস্ত সুদি কারবারিরা কোটিপতি বনে বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও দাদনের খপ্পড়ে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন শত শত মানুষ, অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে সরেজমিনে জানা যায়, গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার সাঘাটা ইউনিয়নের যোগীপাড়া গ্রামের বিপ্লব আকন্দ। তিনি ২০২২ সালে একই গ্রামের মাসুদ রানা ওরফে এপেলকে কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নেন। শর্ত মাসে ১৫ মণ ধানের সমপরিমাণ টাকা দিতে হবে। কিছুদিন লাভ দেওয়ার পরে লাভের টাকা দিতে না পেরে আরও ৩০ হাজার টাকা নেন। গত ৫ বছরে তিনি এক লাখ ৩০ হাজার টাকার জন্য ৪ লাখ টাকার লাভ দিয়েছেন। এরপর টাকা শোধ করতে না পারলে তাকে ৭ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ভয়ে বিপ্লবের মা বিলকিস বেগম জমি বিক্রি করে দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানা এপেলকে ২ লাখ টাকা দিতে গেলে তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে মারধর করে শ্লীলতাহানি করে। এছাড়া এই গ্রামের মোফাজ্জল নামের একজনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ায় তিনি গ্রাম ছাড়া হয়েছেন বলেও জানা যায়। আরও কয়েকজন টাকার ভয়ে গ্রামছাড়া, তাদের ঘরবাড়ি তালাবদ্ধ ।
বিপ্লব আকন্দ এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি মাসুদ রানা এপেলের কাছ থেকে যা টাকা নিয়েছিলাম। তার লাভ ৪ লাখ টাকা দিয়েছি । তবুও এপেল বলেন, এখনো ৭ লাখ টাকা পাবেন । আর টাকা নেওয়ার সময় ফাঁকা চেক দিয়েছি । এখন সে বলতেছে মামলা দেবে আমার বিরুদ্ধে। আমি নিরুপায় হয়ে আমার বাবার জমি বিক্রি করে মায়ের মাধ্যেমে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার লাভসহ ২ লাখ টাকা পাঠালে আমার মাকে মারধর করে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়ার দীর্ঘ দিনেও কোন প্রতিকার পাইনি।
ভুক্তভুগী বিপ্লবের মা বিলকিস বেগম এশিয়া পোস্টকে বলেন, মাসুদ রানা এপেলের কাছে টাকা দিতে তার বাড়িতে গেলে, টাকা কম হওয়ায় সে ও তার স্ত্রী শারমিন আমার ওপর হামলা করে। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেননি। মাসুদ রানা কয়েক বছরেই কোটিপতি হয়েছেন। তার পোষা গুন্ডাদের মাধ্যমে সে সুদের ব্যবসা পরিচালনা করেন । আমি আমার ওপর হামলার বিচাই চাই।

এমন ঘটনা এই গ্রামের অনেকের সঙ্গে ঘটেছে বলে জানা গেছে। এই গ্রামের মো. লিমন মিয়া বলেন, আমি মাসুদ রানা এপেলের কাছ থেকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিলাম। ৩ লাখ টাকা লাভ দেওয়ার পর আসল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে দেরি হওয়ায় আমাকেও মামলার ভয় দেখিয়েছে। আমি বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করে সব টাকা শোধ করে দেই ।
এই গ্রামের আঞ্জু বেগম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার জামাই (হাফেজ মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ) ৩০ হাজার টাকা এপেলের কাছ থেকে নিয়েছিল। মেলাদিন লাভ দিয়েছে। পরে টাকা দিতে না পেরে এলাকা ছেড়েছে। ঢাকায় রিকশা চালাইয়া গত মাসে ৩০ হাজার টাকার লাভসহ দেড় লাখ টাকা দিয়েছে।
এই গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে ভুক্তভুগী মো. উৎসব বলেন, আমি বিদেশ যাওয়ার জন্য মাসুদ রানা এপেলের থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়েছিলাম। ৬ বছরে ৩ লাখ টাকা লাভ দিয়েছি। প্রতি বছরে দেড় লাখ টাকায় ৬০ হাজার টাকা লাভ দিতে হয়েছে। তবুও আসল টাকা শেষ হয়নি। এখনো দেড় লাখ থেকেই গেছে।
এই গ্রামের আব্দুল কাদেরের স্ত্রী ভুক্তভুগী ছকিনা বেগম বলেন, আমার ছেলের বৌ সুদারু মাসুদ রানার এপেলের কাছ ১ লাখ টাকা সুদের ওপর নেয়। পরে লাভ চালাতে চালাতে কোনো উপায় না পেয়ে এখন বাড়ি ছাড়া। এই সময় মাসুদের কিছুই ছিল না। এখন বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছে।
আব্দুল মতিন নামের এক যুবক বলেন, মাসুদ রানা সুদের টাকায় বাড়ি করেছেন। কোটিপতি হয়েছেন সুদের টাকায়। মাসে ১ হাজার টাকায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা লাভ নেন। কেউ বিপদে পড়ে ১ লাখ টাকা নিলে প্রথমে ১০ হাজার টাকা কেটে নিয়ে ৯০ হাজার টাকা দেন।
সাঘাটা ইউনিয়নের দুইবারের সাবেক চেয়ারম্যান হাবলু মিয়া বলেন, মাসুদ রানা এপেল এখন গ্রামের আতঙ্কের নাম। সুদের টাকায় সরকারি জায়গা দখল করে বাড়ি করলেও কেউ প্রতিবাদ করে না। সবাই তাকে ভয় পায়। কারণ তার অবৈধ টাকা আছে। সে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।
সাঘাটা ইউনিয়নের মেম্বার আব্দুল হাই এশিয়া পোস্টকে বলেন, যোগীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মাসুদ রানা এপেলদের এক সময় নুন আনতে পান্তা ফুরাত। এখন সুদের ব্যবসা করে কোটিপতি। এই গ্রামের যারাই টাকার সমস্যায় পরে তার কাছে যায়। ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করিয়ে পরে সুযোগ বুঝে বিপদে ফেলে। আমরা এই প্রতিকার চাই।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাঘাটা ইউনিয়নের যোগীপাড়া গ্রামের অভিযুক্ত মাসুদ রানা এপেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তার বাসায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনে যোগাযোগ করলে ফোন রিসিভ করেনি। বাড়ির ছবি তুলতে গেলে তার স্ত্রী শারমিন বেগম ছবি তুলতে নিষেধ করে বলেন, বাড়ি আমার নামে। তাই আমার অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা যাবে না।
এই বিষয়ে সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, “এই বিষয়ে থানায় কোনো মামলা হয়নি । অভিযোগ হয়েছে কিনা জানি না । যদি অভিযোগ হয়ে থাকে আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।
