logo

ঈদের দিনটাও কাটে বন পাহারায়

ঈদের দিনটাও কাটে বন পাহারায়

সবাই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগিতে ব্যস্ত। কিন্তু সেই সুযোগ হয় না অনেকেরই। সেই আনন্দঘন মুহূর্তে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে দায়িত্ব পালন করছেন বনকর্মীরা। আনন্দ-উৎসবের বিশেষ দিনটিও তাদের কেটেছে নির্জন বনে টহল ও পাহারায়। ঈদের ছুটি না পেলেও দেশের সম্পদ পাহারা দিতে পারায় অনেক খুশি তারা।

জানা গেছে, ঈদের সময় চোরাশিকারি চক্রের তৎপরতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী শিকারের চেষ্টা চালায়। তাই ঈদে সুন্দরবনে কর্মরত সব কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দশনা মেনে নিয়েই বনরক্ষীরা ঈদের দিনটাও কাটিয়েছেন নির্জন সুন্দরবনে। 

ঈদের দিনে সুন্দরবনের বিভিন্ন ফরেস্ট স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কয়েকজন বনরক্ষীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দায়িত্বের কারণে প্রায় কোনো ঈদেই ছুটি মেলে না তাদের। পরিবার থেকে দূরে নির্জন বনেই পালন করতে হয় ঈদ। 

ঈদের দিন বিকালে কাশিয়াবাদ স্টেশনে দেখা হয় খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, বন বিভাগের স্টাফদের সঙ্গে ঈদের দিনটি তিনি টহল কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এ সময় তিনি বনরক্ষীদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেন।

খুলনা রেঞ্জের গেওয়াখালী টহল ফাঁড়িতে কর্মরত বনরক্ষী রাসেল আহমেদ বলেন, কয়েক মাস ধরে গহিন বনে দায়িত্ব পালন করছি। লোকালয় থেকে সেখানে পৌঁছাতে নৌকায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। অল্প কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়েই এবারও সেখানে ঈদ উদযাপন করতে হয়েছে। 

রাসেল বলেন, চাকরির ছয় বছরে মাত্র একবার পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছেন। বাকি সব ঈদ সুন্দরবনেই কাটাতে হয়েছে। মন খারাপ হয়, তবে দায়িত্বই বড়। সে জন্য সবকিছু মানিয়ে নিয়েছেন।

ফেনে কথা হয় বনকর্মী শফিকুল ইসলাম সাহিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই ঈদ নিয়ে চারবার তাকে পরিবার পরিজন ছেড়ে বনে ঈদ উদযাপন করতে হয়েছে। লোকালয় থেকে সেমাই-চিনিসহ বাজার-সদয় নিয়ে একসঙ্গে রান্না করে খেয়ে আবারওে বন রক্ষার জন্য টহল কার্যক্রমে নেমে পড়েন তারা। 

নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মোবারক হোসেন বলেন, গত বছর ঈদের সময় তিনি ভদ্রা টহল ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন। সেখানে ফোনের নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। ঈদের দিন পাঁচজন সহকর্মী মিলে একটি মুরগি ও সেমাই রান্না করে নিজেদের মতো করে ঈদ উদযাপন করেছিলেন। এবারও ঈদের দিনটি তাদের কেটেছে টহল কার্যক্রমে। 

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, চাকরির জন্য অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। আমার ছোট মেয়েটা ফোন করে প্রায়ই জানতে চায়- আব্বু বাড়ি আসবা কবে? তখন কী বলব বুঝে উঠতে পারি না। তাকে সান্ত্বনা দিয়েছি- আমি বাসায় আসছি।

কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন বলেন, পরিবার-পরিজন যখন ঈদের আনন্দে ব্যস্ত, তখন আমরা বনের নিরাপত্তায় টহলে থাকছি। তারপরেও সবকিছু মানিয়ে নিতে হয়। 

খুলনা রেঞ্জের নীলকোমল, কাগা, ভ্রমরখালী, পাটকোষ্টা, গেওয়াখালী, পাশাখালী, ভদ্রা টহল ফাঁড়ির কর্মীরা ঈদের দিন কাটিয়েছেন বনের ভেতরে, ডিউটি করে। এসব স্থানে ফোনের নেটওয়ার্কও নেই। সেখানে দায়িত্বে থাকা বনরক্ষীদের অনেক সময় ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগও হয় না।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জে ড এম হাছানুর রহমান বলেন, ছুটির সময় দুর্বৃত্তরা বনের সম্পদ লুটপাট বা বন্যপ্রাণী শিকারের সুযোগ নিতে পারে। এ কারণে ঈদের সময়ও সুন্দরবনের ভেতরের সব ফরেস্ট অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিবার থেকে দূরে নির্জন বনে দায়িত্ব পালন করলেও দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পেরে গর্ববোধ করেন বনরক্ষীরা। তাদের কাছে সুন্দরবনের নিরাপত্তাই ঈদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।