logo

নানা অব্যবস্থাপনায় চলছিল ক্লিনিক, সিলগালা করা হলো ১৬টি

নানা অব্যবস্থাপনায় চলছিল ক্লিনিক, সিলগালা করা হলো ১৬টি

ফেনী জেলাজুড়ে অনুমোদনহীন এবং অব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানে জেলার ছয়টি উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানে লাইসেন্স না থাকা এবং নানা অনিয়মের দায়ে জেলাজুড়ে ১৬টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সিলগালা ও লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

সম্প্রতি জেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক প্রসূতির মৃত্যুর পর বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত এসব হাসপাতালে তদারকি জোরদার করার দাবি তোলেন স্থানীয়রা। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলাজুড়ে এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সিলগালা ও জরিমানা করা হয়।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফেনীতে বেসরকারি পর্যায়ে অনুমতি প্রাপ্ত ১১৬টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে ৬৫টি ও হাসপাতাল রয়েছে ৫১টি। এর মধ্যে শুধু ফেনী পৌর এলাকায় রয়েছে ৭০টির বেশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মার্চ মাসে পরিদর্শন করা হয়েছে ১১টি প্রতিষ্ঠান এবং চলতি এপ্রিল মাসে পরিদর্শন করা হয়েছে ৩১টি প্রতিষ্ঠান। 

পরিদর্শনকালে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকা, ওটি (অপারেশন থিয়েটার) মানসম্মত না হওয়া, দক্ষ টেকনিশিয়ান ছাড়া ল্যাব পরিচালনা করা,মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাওয়া এবং মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট ব্যবহারের দায়ে জেলার ১৬টি ক্লিনিক সিলগালা করা হয়। 

সিলগালা করা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো হলো- জনতা এক্সরে অ্যান্ড প্যাথলজি ল্যাবরেটরি, ডক্টরস ল্যাব অ্যান্ড শাহিন ক্লিনিক, ফেনী নিউরো কেয়ার হাসপাতাল, ল্যাবএইড লিমিটেড, ফেনী মেডিনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, গ্রীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওয়েলস ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দাগনভূঞা চক্ষু হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াবেটিস সেন্টার, মমতা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আল আহাদ চক্ষু হাসপাতাল, ওয়ান স্টপ মেটারনিটি ক্লিনিক, দাগনভূঞা মেডিকেয়ার হাসপাতাল, সোনাগাজী ডাকবাংলা ল্যাব, ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল, দাগনভূঞা হাজী ক্লিনিক ও আল খিদমাহ ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

এ ছাড়া ফেনী কার্ডিয়াক সেন্টার অ্যান্ড স্পেসালিস্ট হাসপাতালের এক্স-রে লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এক্স-রে কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়। এ সময় ওই হাসপাতাল ও ফেনী বাইজিদ হেলথ সার্ভিস ও বায়জিদ সাইক্রিয়াটিক হাসপাতালকে লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হয়। 

এ ছাড়া মনিটরিং সুপারভিশনে অনিয়ম সংশোধনীসহ ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে। এগুলো হলো- দাগনভূঞা লাইফ এইড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, পপুলার হাসপাতাল ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, ডা. শাহ আলম চক্ষু হাসপাতাল, পদ্মা ডিজিটাল ল্যাব, দাগনভূঞা মা ও শিশু হাসপাতাল, সোনাগাজী ডিজিটাল ল্যাব, গ্রিন ল্যাব, গ্লোবাল হেলথ, সিটি হেলথ কেয়ার, ফুলগাজী ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, নিউ ফুলগাজী স্কয়ার, সেবা ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, ওয়াহিদুর রহমান স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বায়োনিক রিসার্চ।

এসব অভিযানে গিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশকিছু ভয়ংকর তথ্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অধিকাংশ ক্লিনিকে ডিপ্লোমাধারী নার্সের পরিবর্তে সাধারণ কর্মীদের দিয়ে ওটি এবং সেবা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নাজুক এবং অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয় জীবাণুমুক্তকরণের সরঞ্জাম নেই। সরকারি তালিকার তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো পরীক্ষার ফি আদায়েরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

অভিযানে অংশ নেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা জানান, জনস্বার্থ রক্ষায় এই অভিযান কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, বরং অনিয়মের বিরুদ্ধে।

ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, আমরা স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই— মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। যারা নিয়মের মধ্যে থেকে সেবা দেবে, তাদের স্বাগত জানাই, কিন্তু যারা পকেট কাটছে এবং ঝুঁকি তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। পুরো জেলার তালিকা আমাদের হাতে আছে, কোনো উপজেলা বাদ যাবে না। আমরা ফেনীতে অনুমোদনহীন কোনো হাসপাতাল চলতে দেব না। 

স্থানীয়রা বলেন, এই অভিযান যেন কেবল এক দিনের লোক দেখানো না হয়। অনেক সময় অভিযানের পর প্রতিষ্ঠানগুলো আবার নাম পাল্টে বা গোপনে চালু হয়ে যায়। তাই নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন ফেনীবাসী।