Advertisement

বরিশালে ৯ দিনে দুই বিস্ফোরণ, জেলাজুড়ে উদ্বেগ

এশিয়া পোস্ট নিউজ, বরিশাল
বরিশালে ৯ দিনে দুই বিস্ফোরণ, জেলাজুড়ে উদ্বেগ
বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ককটেলের লাল টেপ, তার ও বোমার অবশিষ্টাংশ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

বরিশালে মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে দুটি বিস্ফোরণের ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। একটি ঘটেছে নগরের আদালত চত্বরে, অন্যটি জেলার বাকেরগঞ্জের প্রত্যন্ত দুধলমৌ গ্রামের একটি বাড়িতে।

Advertisement

বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে আদালত চত্বরে ককটেলসদৃশ একটি বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটে। এর নয় দিন আগে গত ৩ আগস্ট দুধলমৌয়ে হাতে তৈরি বোমার বিস্ফোরণে একই পরিবারের তিনজন গুরুতর দগ্ধ হন।

দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও জননিরাপত্তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। আদালত চত্বরে বিস্ফোরণে কেউ হতাহত না হলেও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

অন্যদিকে দুধলমৌয়ের ঘটনায় পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে হাতে তৈরি শক্তিশালী বোমার তথ্য। তবে দুটি ঘটনার ক্ষেত্রেই বিস্ফোরকগুলো কারা তৈরি করেছে, কোথা থেকে এলো, এর পেছনের উদ্দেশ্য কী এবং কারা জড়িত—সেসব প্রধান প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বুধবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে বরিশাল আদালত চত্বরের মূল ফটকের কাছাকাছি জুডিশিয়াল ভবনের সামনে বিকট শব্দে বিস্ফোরণটি ঘটে। বিস্ফোরণের শব্দে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও আদালতকর্মীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পরপরই বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। ঘটনার পর পুরো আদালত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

আইনজীবীরা ঘটনাটিকে পরিকল্পিত নাশকতা বলে মন্তব্য করেছেন। বরিশাল মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দীন আহমেদ পান্না বলেন, কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যে এ নাশকতার পেছনে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

অ্যাডভোকেট একেএম মীর জাহিদুল কবির বলেন, আগামী ১৬ আগস্ট বরিশালে আইনমন্ত্রীর আসার কথা রয়েছে। শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করতেই একটি মহল এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সুশান্ত সরকার জানান, সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাটি তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।

আর পুলিশ কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ বলেন, বিস্ফোরিত বস্তুটি কী ধরনের এবং কে বা কারা সেখানে রেখেছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এতে পটকার বারুদ ব্যবহার করা হয়েছে।

এর আগে গত ৩ আগস্ট সকালে বাকেরগঞ্জের ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ গ্রামের শাহ আলম হাওলাদারের বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে শাহ আলমের স্ত্রী হনুফা বেগম, মেয়ে ইতি এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাতি ফাহিম গুরুতর দগ্ধ হন। উদ্ধার করে তাদের প্রথমে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরবর্তীতে তিনজনকেই ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়।

ঘটনার পর ঢাকা থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল আলামত সংগ্রহ করে। বরিশালের পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিস্ফোরিত বস্তুটি ছিল হাতে তৈরি বোমা। পটকার বারুদ ও পেট্রোলের সংমিশ্রণে এটি তৈরি করা হয়েছিল। এতে স্প্লিন্টার ব্যবহার করা হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।

তিনি আরও বলেন, বোমা তৈরিতে অভিজ্ঞ কেউ এ কাজের পেছনে রয়েছে। এ ঘটনায় জামাল হাওলাদার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করেছেন। পারিবারিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, নাশকতা কিংবা অগাস্ট মাসকে কেন্দ্র করে কোনো চক্রান্ত রয়েছে কি না—সব দিকই তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাইদ মেমন বলেন, নয় দিনের ব্যবধানে আদালত চত্বর ও বসতবাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের। স্পর্শকাতর স্থাপনায় এ ধরনের ঘটনা ঘটানো ব্যক্তিদের উৎস ও বোমা তৈরির কারিগরদের দ্রুত খুঁজে বের করাই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান চ্যালেঞ্জ।