হাটভর্তি চামড়া, বাজারজুড়ে নীরবতা

ঈদুল আজহার পর জমে ওঠার কথা ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার হাট শম্ভুগঞ্জ। কিন্তু বাস্তবে হাটের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সারি সারি চামড়ার স্তূপ। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে লবণ মাখানো চামড়ার গন্ধ। কোথাও শ্রমিকরা চামড়া উল্টেপাল্টে দেখছেন, কোথাও ব্যবসায়ীরা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। কিন্তু পুরো হাটজুড়ে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটির অভাব, সেটি হলো ক্রেতা।
রোববার (৩১ মে) বিকেলে শম্ভুগঞ্জ চামড়ার হাটে এই চিত্র দেখা গেছে। অনেক ব্যবসায়ী খোলা আকাশের নিচে চামড়া সংরক্ষণ করে রেখেছেন। কেউ কেউ সম্ভাব্য ক্রেতার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছেন। তবে আড়তদারদের সংখ্যা হাতে গোনা। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আড়তদারদের দরদাম নিয়েও কোনো প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না। এদিকে ট্যানারি মালিকদের প্রতিনিধি বা ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকা ব্যবসায়ীদের চোখে মুখে স্পষ্ট হতাশার ছাপ।
চামড়া আছে, বাজার নেই
জানা গেছে, কোরবানির পর এ হাটে বিভাগের ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা জেলা ছাড়াও সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার কিছু এলাকা থেকেও চামড়া নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। এ হাট থেকে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনে নিয়ে যান। শনিবার সাপ্তাহিক চামড়ার হাট থাকলে ঈদ উপলক্ষে মঙ্গলবারও বিশেষ হাট বসে। তবে ঈদের পর থেকে ট্যানারি মালিকদের কোনো প্রতিনিধি চামড়া কিনতে এখনও হাটে আসেনি। পরবর্তীতে আসবে কিনা তাও এখনও নিশ্চিত হতে পারছেন না আড়তদাররা। এদিকে এ বছর ঢাকার ভেতরে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
হাটে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, হাটজুড়ে হাজার হাজার গরু ও ছাগলের চামড়ার স্তূপ থাকলেও নেই ক্রেতার উপস্থিতি। ট্যানারি মালিক ও বড় পাইকারদের অনুপস্থিতিতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বেচাকেনা। ফলে চামড়া সংগ্রহ করে হাটে আসা মৌসুমী ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে কাঁচা চামড়া কিনেছেন তারা। এরপর প্রতি চামড়ায় প্রায় ২০০ টাকার লবণ এবং গড়ে ১০০ টাকার শ্রমিক ব্যয় করতে হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বাজারে ক্রেতা না থাকায় বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাদের একটাই প্রশ্ন, যদি ক্রেতাই না আসে, তবে এত কষ্ট করে সংগ্রহ করা চামড়া যাবে কোথায়?
‘বড় ক্রেতা না এলে সব পুঁজি ডুবে যাবে’
শম্ভুগঞ্জ হাটে চামড়া নিয়ে আসা ব্যবসায়ী কলিম উদ্দিন বলেন, ‘বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার হাট হিসেবে পরিচিত শম্ভুগঞ্জ হাট। ঈদের দিন থেকে মানুষজনের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেছি। অনেক আশা নিয়ে হাটে এসেছি। কিন্তু একজন বড় ক্রেতারও দেখা পাইনি। এখন চামড়া বিক্রি না হলে সব পুঁজি ডুবে যাবে।’

একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন তারাকান্দা থেকে আসা ব্যবসায়ী রিবিদাস বলেন, ‘প্রতি চামড়ার পেছনে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। লবণ কিনেছি, শ্রমিক ভাড়া করেছি। এখন যদি চামড়া বিক্রি না হয়, তাহলে কয়েক লাখ টাকা লোকসান হবে। এত বড় ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করে এমন অবস্থায় পড়ব, তা ভাবিনি।’
ট্যানারি সিন্ডিকেটে হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা
স্থানীয় আড়তদার সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদের মৌসুমে চামড়ার বাজারে অস্থিরতা দেখা গেলেও এবার সংকট তুলনামূলক বেশি। এবার এখন পর্যন্ত ট্যানারি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নেই। বড় ক্রেতারা না আসায় বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। অথচ হাটে চামড়ার সংকট নেই, সংকট হলো ক্রেতার। যারা মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহ করেছেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি বিপদে। সংগ্রহ করা চামড়া ন্যায্য দামে বিক্রি করা যাবে কিনা এ নিয়ে আমরাও দুশ্চিন্তায় সময় পার করছি। ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেট করে তাদের প্রতিনিধিদের হাটে পাঠাচ্ছে না। কারণ, তারা না আসলে চামড়ার দাম একেবারেই নেমে যাবে।
ট্যানারি মালিক ও পাইকার না আসায় হাট জমেনি জানিয়ে হাটের ইজারাদারে প্রতিনিধি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘সরকার প্রতিবছর কাঁচা চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে সেই মূল্য অনেক সময় কার্যকর হয় না। ঈদের মৌসুমে কাঁচা চামড়ার বাজার সচল রাখতে সরকার, ট্যানারি মালিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। সময়মতো ট্যানারি মালিকদের মাঠে নামানো এবং সংগ্রহকারীদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে প্রতি বছর একই সংকট ফিরে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ট্যানারিমালিকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এখানে চামড়ার মূল্য একেবারে কমিয়ে দেয়। এতে প্রান্তিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গত বছরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এইবার সরকারের ঠিক করে দেওয়া মূল্য দিয়ে ট্যানারিমালিকরা চামড়া কিনবেন বলে আমরা আশা করছি।’
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যারা মৌসুমি ব্যবসায়ী, তাদের বিনামূল্যে লবণ দেওয়া হয়েছে। লবণ দেওয়া চামড়া ৩০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। কম দাম হলে তো তারা চামড়া বিক্রি করবেন না। আমরা চাই, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেন নষ্ট না হয়। যারা চামড়া কেনেন, তাদের বলা হয়েছে যেন সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কেনা হয়।’
