দিনে-রাতে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ময়মনসিংহ, অতিষ্ঠ জনজীবন

দুপুরের গরমে ঘরের ভেতর বসে থাকা দায়। বৈদ্যুতিক পাখা বন্ধ। জানালা খুলেও তেমন বাতাস পাওয়া যাচ্ছে না। শিশুরা ঘামছে, বয়স্করা অস্থির হয়ে উঠছেন। একটু পরপর সবাই তাকাচ্ছেন মিটার কিংবা ফ্যানের দিকে—বিদ্যুৎ ফিরল কি না। বিদ্যুৎ আসে, কিছুক্ষণ থাকে, আবার চলে যায়। কখন আসবে, কতক্ষণ থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এমনই চিত্র পাওয়া গেছে। তীব্র গরমের মধ্যে কোনো কোনো এলাকায় দিনে-রাতে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করছেন তারা। শহরের তুলনায় পল্লি ও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
শুধু যে ঘরে স্বস্তি নেই, তা নয়। বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ছোট ব্যবসা, কারখানা, রেস্তোরাঁ, অনলাইনভিত্তিক কাজ, মাছের খামার ও পোল্ট্রি উৎপাদন। বিদ্যুৎনির্ভর মানুষের কাছে লোডশেডিং এখন আর সাময়িক অসুবিধা নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা।
এই সংকটের পেছনে চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি রয়েছে সরবরাহের ঘাটতি। ময়মনসিংহ নগরীর শম্ভুগঞ্জের গুদারাঘাট এলাকায় ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এক মাসের বেশি সময় ধরে পুরোপুরি বন্ধ। কারণ, কেন্দ্রটি প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না।
ময়মনসিংহ জোনে অফ-পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ৪৫০ থেকে ৪৬০ মেগাওয়াট। পিক সময়ে চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০০ থেকে ৫২০ মেগাওয়াটে। দিনের অন্যান্য সময়েও চাহিদা থাকে ৪৩০ থেকে ৪৫০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।
তারাকান্দা উপজেলার তারাটি গ্রামের বাসিন্দা রিপন মিয়া বলেন, তাদের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজেও বিঘ্ন ঘটছে।
তীব্র গরমের মধ্যে দিনের পর রাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমাতে পারছেন না অনেকে। শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। বয়স্কদের জন্যও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকা কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
পার্শ্ববর্তী আটাদার গ্রামের মধ্যবয়সী আব্দুল হাইয়ের ভাষ্য, দিনে গরমে ঘরে থাকা যায় না, রাতে ঘুমানো যায় না। বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় কখনও বারান্দায়, কখনও উঠানে বসে থাকতে হয়। বিদ্যুৎ এলে আবার সবাই দ্রুত মোবাইল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চার্জে দেন। কারণ, পরের বার কখন বিদ্যুৎ যাবে, কেউ জানেন না।
ময়মনসিংহ সদরের আলালপুর গ্রামের গৃহিণী সোমা খাতুনের সমস্যাটি আরও বিস্তৃত। তাঁর অভিযোগ, দিন ও রাতে কয়েকবার করে লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবার প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে ভোগান্তি বেড়েছে।
বিদ্যুতের এই অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি বিপাকে ফেলছে শিক্ষার্থীদের। দিনের গরমে পড়াশোনা করা কঠিন, রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে আলো ও বাতাসের সংকট তৈরি হয়। অনলাইন ক্লাস বা ল্যাপটপে কাজ করা শিক্ষার্থীদের সমস্যাও বাড়ছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় ইন্টারনেট সংযোগও দুর্বল হয়ে পড়ে।
ত্রিশালের বৈলর গ্রামের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার জানায়, দিনে ক্লাস, রাতে পড়াশোনা। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে আলো জ্বালানো থেকে শুরু করে মোবাইল-ল্যাপটপ চালানো—সবই কঠিন হয়ে যায়। পরীক্ষার সময় হলে সমস্যাটা আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়।
ফুলপুরের সিংহেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা মো. রহিম বলেন, আমাদের কাছে এখন লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। কখন বিদ্যুৎ যাবে, কখন আসবে—কেউ বলতে পারে না। গরমে বাইরে থাকা যায় না, আবার ঘরের ভেতরেও থাকা যায় না।
বিদ্যুৎনির্ভর ছোট ব্যবসার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। দোকান, ওয়ার্কশপ, ছোট কারখানা ও রেস্তোরাঁয় কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জেনারেটর বা ব্যাটারির বিকল্প ব্যবস্থা করলে খরচ বাড়ছে। ফলে একদিকে কাজের সময় কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
ময়মনসিংহের মাছচাষিরাও এর বাইরে নন। ত্রিশালের ধানিখোলা গ্রামের মাছচাষি শাকিল মাহমুদ জানান, দিনের বড় একটা সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। রেণু ও পোনা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।
পোলট্রি খামারে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। ময়মনসিংহ সদরের গোপালনগর গ্রামের ব্রয়লার খামারি নজরুল ইসলাম বলেন, গরমের সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকা মানে শুধু অন্ধকার নয়, খামারের প্রতিটি ঘণ্টা আমাদের জন্য ঝুঁকি। বাচ্চাগুলোকে ঠান্ডা রাখতে ফ্যান চালাতে না পারলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ক্ষতি শুরু হয়।
খামারিদের ভাষ্য, গরমের সময় বিদ্যুৎ শুধু আলো বা পাখা চালানোর জন্য নয়; এটি উৎপাদন টিকিয়ে রাখার অন্যতম শর্ত। বিদ্যুৎ না থাকলে খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিংও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এই ভোগান্তির পেছনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, সেটি হলো নগরীর শম্ভুগঞ্জের গুদারাঘাট এলাকায় অবস্থিত ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ থাকা। রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রায় তিন দশক আগে ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ এবং শিল্পায়নের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রটির গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। কিন্তু দেশে গ্যাসের সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রটির উৎপাদনও কমতে থাকে।
আরপিসিএলের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে কেন্দ্রটির প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৪৫ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোনো কোনো মাসে উৎপাদন ৪০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। অর্থাৎ ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ণ সক্ষমতায় চলছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার আগে সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল না। এখন উৎপাদন শূন্য। সক্ষমতার তুলনায় দীর্ঘদিন কম উৎপাদনের পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদ বলেন, জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহের জটিলতার কারণে জাতীয় পর্যায়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রেও। গ্যাস সরবরাহ আবার চালু হলে দ্রুত উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
ময়মনসিংহ পাওয়ার স্টেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাদ মুহা. সাবের জানান, কেন্দ্রটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় নিতে প্রায় ৪২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
কেন্দ্রটি চালু থাকলে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা ছাড়াও টাঙ্গাইল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। এখন কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় ওই অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পাওয়ার গ্রিডের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ময়মনসিংহ গ্রিডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল হক বলেন, সন্ধ্যার সময় ময়মনসিংহ জোনের জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইলে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১ হাজার ৯১ থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট।
তার ভাষ্য, দিনের বিভিন্ন সময়ে চাহিদা অনুযায়ী লোডশেডিংয়ের মাত্রা পরিবর্তিত হয়। পিক সময়ে লোডশেডিং বেশি থাকে, অফ-পিক সময়ে কমে আসে। বর্তমানে ময়মনসিংহ জোনে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। তবে ঘাটতি কমানোর চেষ্টা চলছে।



