এই গ্রামে নারীদের মনজুড়ে শুধু শিল্পকর্ম

টিকইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম। তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের স্মৃতিবিজড়িত এ গ্রামে প্রায় ৯০টি হিন্দু পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের লোক সংখ্যা চার শতাধিক। গ্রামটির সব নারীই যেন চিত্রশিল্পী। গ্রামটির নারীদের কাছে প্রতিটি বাড়ির দেয়াল আর মেঝেই যেন ক্যানভাস। তাদের হাতের ছোঁয়ায়-শিল্পকর্মে প্রতিটি বাড়ির কাঁচারি ঘর, রান্নাঘর থেকে শুরু করে শোবার ঘর পর্যন্ত, প্রতিটি ঘরের দেয়াল আর মেঝেই আলপনায় ভরা।
প্রথমে গ্রামের একটি আলপনা বাড়ি থেকে এখন আলপনা গ্রাম। বেশি আলপনা আঁকা হয় পূজা-পার্বণে। দেয়ালে দেয়ালে কারুকাজ দেখে ২০১৯ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক গ্রামটির নাম ‘আলপনা গ্রাম’ নামে ঘোষণা করেন। প্রায় দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ গ্রামে এসব হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস। বংশ পরম্পরায় বছরের পর বছর ধরে বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন গ্রামের ঝি-বউয়েরা। মাটির তৈরি এসব বাড়ির ভেতরে ও বাইরের কোনো দেয়ালই বাদ পড়ে না তুলির আঁচড় থেকে।
এই গ্রামের আলপনা শিল্পী নয়ন মনি ও বিপতী রানী দাস বলেন, আগে আলপনা শুধু কয়েকটি বাড়িতেই আঁকা হতো। ধীরে ধীরে এ গ্রামের সব বাড়ির নারীরাই আলপনা এঁকে বাড়িকে সাজিয়ে রাখেন। বছরে দুইবার লক্ষ্মী পূজা ও দুর্গা পূজায় বাড়ি সাজানো হয়। দুই পূজায়ই গ্রামের সব বাড়িঘর আলপনা দিয়ে সাজানো হয়। আগে এ গ্রামের নাম টিকইল থাকলেও সম্প্রতি ‘আলপনা গ্রাম’ নামেই সবাই গ্রামটিকে চেনে।
অপর আলপনা শিল্পী প্রভাতী রানী, ধীরেন্দ্র বর্মন, প্রদীপ চন্দ্র বর্মন বলেন, আলপনা আঁকতে আগে স্থানীয় লাল মাটি, খড়িমাটি, চাল ভিজিয়ে ছেঁচে বানানো সাদা রঙ ব্যবহার হতো। এসবের সঙ্গে বিভিন্ন প্রাকৃতিক গাছের কষ মেশানো হতো আলপনা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য। বর্তমানে বাজারে পাওয়া রঙ দিয়েই আঁকা হয় আলপনা।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভাত-কাপড়ের অভাব থাকলেও বাড়িঘর সাজিয়ে রাখতে পছন্দ করেন তারা। যেন আগে আলপনায় বাড়ি সাজানো, তারপর অন্য কিছু। একটি বাড়ি সাজাতে বর্তমানে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা দরকার হয়। বছরে দুবার সাজাতে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ কৃষি কাজ করে খেয়ে-পরে কোনো রকম আছেন। দারিদ্র্য থাকলেও তাদের বিশ্বাস, এ আলপনা দিয়েই তাদের ঘরে লক্ষ্মী প্রবেশ করে।
তারা আরও জানান, অনেক বছর ধরে আলপনা আঁকা হলেও তা ছিল সীমিত পরিসরে। পরে এ গ্রামের বধূ দেখন বর্মনের হাত ধরে বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন রঙের, বাহারি আলপনার প্রচলন ও প্রসার হয়েছে। আগে এ গ্রামের নারীরা খুব বেশি করে আলপনা করতেন না। কিন্তু তার দেখাদেখি গত কয়েক বছর ধরে এ গ্রামের প্রতিটি বাড়ির বেশির ভাগ দেয়ালেই আলপনা জায়গা করে নিয়েছে। এ কারণে দেখনকে আলপনার উদ্যোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
আলপনা শিল্পী দেখন বর্মন বলেন, একসময় হয়তো মাটির বাড়ি থাকবে না, কিন্তু পাকা বাড়িতেও এ আলপনা এঁকে ঐহিত্য ধরে রাখবেন এ গ্রামের নারীরা। এ গ্রামের আলপনা যেন দেশের সব জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং বিদেশেও এর বিস্তার ঘটে সে আশাই করেন এ গ্রামের বাসিন্দারা।
ওই গ্রামের খুদে আলপনাশিল্পী স্কুলছাত্রী রিমা জানান, মা এবং দাদির আঁকা দেখে দেখে আলপনা আঁকতে শিখেছেন তিনি। তার বয়সী গ্রামের অনেক মেয়েকে আলপনা আঁকার তালিমও দেন তিনি।
এদিকে গ্রামবাসীর দাবি, গ্রামের প্রায় সব পরিবারই আলপনায় বাড়িঘর সাজিয়ে রাখলেও শুধুমাত্র দেখন বর্মনের বাড়ির দিকেই যেন নজর সবার। আলপনা গ্রামের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে আর্থিকসহ অন্যান্য সহযোগিতা প্রয়োজন সব পরিবারের জন্যই। বেশির ভাগ পরিবার ততটা সচ্ছল না হওয়ায় সবারই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।
এ বিষয়ে লোকজ গবেষক ড. মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, এই গ্রামের মানুষ সবসময় পরিপাটি আলপনা এঁকে বাড়িঘরের সৌন্দর্য বর্ধন করে থাকেন। এই গ্রামে কোনো শিশুর জন্ম হলে সে-ও রুচিশীলতার মধ্যে বড় হতে থাকে। দর্শনীয় স্থান না হলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ দেখতে আসেন সুন্দর সাজানো-গোছানো আলপনায় আঁকা গ্রামটি।

