ইতালিতে ট্রিপল মার্ডার: একমাত্র ছেলে বেঁচে নেই জানেন না মা

একমাত্র ছেলেকে ঘিরেই ছিল ৬০ বছর বয়সি জাহানারা বেগমের সব স্বপ্ন। সেই ছেলে প্রবাসে থেকেও প্রতিদিন মায়ের খোঁজ নিতেন। কিন্তু ইতালির রোমে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে স্ত্রী-শিশুকন্যাসহ নিহত হয়েছেন কামাল উদ্দিন বাবুল। পরিবারের স্বজনরা এখনও সেই খবরটি গোপন রেখেছেন বৃদ্ধা মায়ের কাছ থেকে। তিনি এখনও বিশ্বাস করেন, ছেলে বেঁচে আছেন।
শনিবার (২৭ জুন) বিকেলে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের বিজয়নগর এলাকায় নিহত কামাল উদ্দিন বাবুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। ঘরে বসে বিলাপ করছেন মা জাহানারা বেগম। চোখের পানি মুছতে মুছতে বারবার বলছেন, ‘আমার বাবুল আবার আইবো, আমার বাবুলের কিছু হইবো না।’
পরিবারের সদস্যরা জানালেন, মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে এখনও তাকে ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, বাবুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
ইতালির স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তির ভিয়া মন্তিলিও এলাকার একটি পার্ক থেকে কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং পাঁচ বছর বয়সি কন্যা আরিশার মরদেহ উদ্ধার করে ইতালীয় পুলিশ। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তাদের ছেলে অয়ন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ইতালীয় পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে জীবিকার সন্ধানে ইতালিতে পাড়ি জমান কামাল উদ্দিন বাবুল। প্রবাসজীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ইতালিতে গড়ে তুলেছিলেন একটি সুখী সংসার। কিন্তু একই গ্রামের শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বাবুলের স্ত্রীর পুরোনো পারিবারিক বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে স্বজনদের দাবি।

স্বজনরা জানান, ঘটনার দিন বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে শাহাদাতের সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে শাহাদাত ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন এবং অয়ন প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেন তার ফেসবুকে একটি রহস্যময় স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।’ শনিবার ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শাহাদাতের ছবি প্রকাশ করে তাকে এই ট্রিপল মার্ডারের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে, শাহাদাতের বড় ভাই সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন জানান, চার বছর আগে শাহাদাত তার সব সম্পত্তি বিক্রি করে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার তেমন কোনো যোগাযোগ ছিল না।
নিহত কামালের বাবা সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রায় এক বছর আগে দেশে আসার সময় তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দিয়ে একটি উড়ো চিঠি পাঠানো হয়েছিল। বিষয়টি তখন মৌখিকভাবে কোম্পানীগঞ্জ থানাকে জানানো হয়েছিল।
এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম বলেন, সেসময় মৌখিকভাবে বিষয়টি থানা-পুলিশকে জানানো হয়েছিল। তবে তারা পরে বিদেশে চলে যাওয়ায় এ বিষয়ে আর কোনো আপডেট জানানো হয়নি।






