দেশের বড় সম্পদ ‘মানুষ’ গড়ার জাতীয় পরিকল্পনা আছে?

প্রতি বছর লাখো তরুণ-তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে বের হচ্ছেন। তাদের প্রত্যেকের চোখে থাকে স্বপ্ন। একটি ভালো চাকরি, একটি ভালো জীবন, পরিবারের জন্য কিছু করার তাগিদ। কিন্তু একই সময়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের একটি অভিযোগ প্রায়ই শুনি—যোগ্য মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে চাকরিপ্রার্থী, অন্যদিকে জনবল খুঁজছে প্রতিষ্ঠান।
তাহলে সমস্যা কোথায়? আমার কাছে উত্তরটি খুব সহজ। বাংলাদেশে মানুষের অভাব নেই। অভাব হলো দক্ষ, কর্মদক্ষ এবং শিল্প-উপযোগী মানবসম্পদের।
এই কারণেই আমি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটটি আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। অনেক বছর পর আমার মনে হয়েছে, আমাদের উন্নয়ন চিন্তায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন বলতে আমরা মূলত রাস্তা, সেতু, ফ্লাইওভার, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পকে বুঝেছি। এসব বিনিয়োগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু শুধু কংক্রিট দিয়ে একটি উন্নত দেশ তৈরি হয় না। একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায় তার মানুষ।
একজন দক্ষ প্রকৌশলী একটি সেতু নির্মাণ করেন। একজন উদ্যোক্তা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেন। একজন ভালো শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলেন। একজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ একটি শিল্পকারখানা সচল রাখেন। একজন প্রশিক্ষিত প্রবাসী দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন। অর্থাৎ অবকাঠামো সুযোগ তৈরি করে, আর দক্ষ মানুষ সেই সুযোগকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে রূপ দেয়। এ কারণেই আমি মনে করি, এবারের বাজেট একটি সঠিক দিক নির্দেশ করেছে। বাজেটের দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে সবচেয়ে বেশি আশাবাদি করেছে।
বাজেটে শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, প্রবাসী কর্মী, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো আলাদা আলাদা বিষয় নয়। সবগুলো একসঙ্গে একটি বার্তা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ বুঝতে শুরু করেছে যে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রাকৃতিক সম্পদ নয়। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের মানুষ। আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য অত্যন্ত ইতিবাচক। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, প্রযুক্তি এবং ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়াও সময়োপযোগী।
আজকের পৃথিবীতে শুধু ডিগ্রি দিয়ে কর্মজীবনে সফল হওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠান এখন এমন মানুষ খুঁজছে, যারা সমস্যা সমাধান করতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারে।
এই বাস্তবতাকে বাজেট স্বীকার করেছে। এটি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। প্রশিক্ষণ নয়, কর্মসংস্থানের দিকে। বাজেটের একটি বিষয় আমার বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
শুনতে সাধারণ একটি উদ্যোগ মনে হলেও এটি দেশের অন্যতম বড় সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু বেকারত্ব নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা দক্ষতার অমিল। প্রতিষ্ঠান বলছে, দক্ষ মানুষ নেই। তরুণরা বলছে, চাকরি নেই। দুই পক্ষই অসন্তুষ্ট। এতে বোঝা যায়, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মধ্যে এখনো একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। যারা প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিয়ে আসবে না, তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানোর পরিকল্পনাও বাস্তবসম্মত। কারণ প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়। প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান তৈরি করা।
প্রযুক্তি খাতে বছরে দুই লাখ কর্মসংস্থান এবং ফ্রিল্যান্সিং ও সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে আট লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। স্টার্টআপ ফান্ডের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পরিকল্পনাও প্রশংসনীয়। কারণ উদ্যোক্তা তৈরি মানে শুধু নতুন ব্যবসা নয়, নতুন কর্মসংস্থানও।
বিদেশগামী কর্মীদের জন্য স্কিল ভেরিফিকেশন, স্মার্ট স্কিল ব্যাংক, প্রবাসী কার্ড এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডিজিটাল সনদের উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এত দিন শ্রম রপ্তানি করেছে। এখন সময় দক্ষতা রপ্তানির। কারণ দক্ষ কর্মী বেশি আয় করে। বেশি সম্মান পায়। দেশের জন্যও বেশি মূল্য তৈরি করে।
কিন্তু একটি বড় ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে। বাজেট পড়তে পড়তে একটি প্রশ্ন বারবার মনে এসেছে। আমাদের কি একটি জাতীয় মানবসম্পদ কৌশল আছে? নাকি শুধু মানবসম্পদ খাতে কিছু বাজেট বরাদ্দ আছে? এই দুটি বিষয় এক নয়। বাজেট অর্থ বরাদ্দ করে। কৌশল পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে যুক্ত করে। শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক, শিল্প, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তি, প্রবাস, আজীবন শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা।
বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করা। অন্য দেশগুলো আমাদের কী শিখিয়েছে? সিঙ্গাপুরের কথা বললে অনেকে বড় বড় ভবনের কথা বলেন। আমি বলি মানুষের কথা। সেখানে শেখা কখনো শেষ হয় না। চাকরিজীবীরাও নিয়মিত নতুন দক্ষতা অর্জন করেন। প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করে। সরকার সেই বিনিয়োগে সহায়তা করে। ফলে পুরো অর্থনীতি প্রতিযোগিতামূলক থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়াও একই কাজ করেছে। শিল্পনীতি এবং শিক্ষানীতিকে একসঙ্গে এগিয়েছে। জার্মানিতে শিক্ষার্থী একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে এবং কর্মক্ষেত্রে শেখে। ফলে পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই তারা কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। বাংলাদেশও এসব দেশ থেকে শিখতে পারে। তবে হুবহু অনুকরণ নয়। আমাদের বাস্তবতা অনুযায়ী আমাদের নিজস্ব মানবসম্পদ উন্নয়ন মডেল তৈরি করতে হবে।
আমরা প্রায়ই বলি, কতজন প্রশিক্ষণ পেল? কতজন সনদ পেল? কতজন ভর্তি হলো? কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কতজন চাকরি পেল? কতজনের আয় বাড়ল? কতজন আন্তর্জাতিক সনদ পেল? কতজন নিয়োগদাতা সন্তুষ্ট? কতটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ল? কারণ সনদ অর্থনীতি গড়ে না। দক্ষতা গড়ে।
বেসরকারি খাতকে আরও যুক্ত করতে হবে
সরকার একা পুরো দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে পারবে না। কারণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তারা জানে ভবিষ্যতে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে। তাই কর্মীদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে কর-সুবিধা দেওয়া, শিক্ষানবিশ কর্মসূচিতে উৎসাহ দেওয়া এবং দক্ষতা উন্নয়নে যৌথ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। যদি আমরা যন্ত্রপাতি ও শিল্পে বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা দিতে পারি, তাহলে মানুষের দক্ষতা উন্নয়ন কেন নয়?
সমন্বয়ই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি। মানবসম্পদ উন্নয়ন কোনো একক মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, শ্রম, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, যুব, প্রবাসী কল্যাণ, বাণিজ্য, বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
এজন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে একটি জাতীয় মানবসম্পদ কাউন্সিল গঠন করা যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানির জন্য পরিচিত। এই সাফল্য অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। কিন্তু আগামী দশকে বাংলাদেশের আরেকটি বড় পরিচয় হওয়া উচিত দক্ষ মানবসম্পদ।
আমি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যাবে আমাদের দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, স্বাস্থ্যকর্মী, ডিজিটাল বিশেষজ্ঞ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, নির্মাণ পেশাজীবী এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞরা। কম খরচের শ্রমিক হিসেবে নয়। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবী হিসেবে। একটি সেতু একদিন পুরোনো হবে। একটি ভবন একদিন সংস্কারের প্রয়োজন হবে। কিন্তু মানুষের ওপর করা বিনিয়োগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফল দেয়।
আমি বিশ্বাস করি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সঠিক দিকটি বেছে নিয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের আর বিচ্ছিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পের দরকার নেই। দরকার একটি সমন্বিত জাতীয় মানবসম্পদ ব্যবস্থা। কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু উন্নত অবকাঠামোর মধ্যে হবে না। প্রতিযোগিতা হবে দক্ষ মানুষের মধ্যে। হয়তো আগামী দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় প্রকল্প নতুন রাস্তা বা সেতু নির্মাণ হবে না। সবচেয়ে বড় জাতীয় প্রকল্প হবে মানুষ গড়ার প্রকল্প।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট।






