ঘাটতির ভয় ও অর্থনীতির সত্য

এম এম মুসা
ঘাটতির ভয় ও অর্থনীতির সত্য
এম এম মুসা। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

বাজেট ঘাটতি নিয়ে বাংলাদেশে একটি গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটি হলো, ঘাটতি মানেই বিপদ, ঋণ মানেই ধ্বংস, সরকারি ব্যয় মানেই অপচয়। কিন্তু অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তক বলে অন্য কথা। পল ক্রুগম্যান আজীবন শিখিয়েছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপট সবকিছু নির্ধারণ করে। ২০২৬-২৭ সালের বাংলাদেশের বাজেটকে সেই প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হবে।

Advertisement

বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। একটি অর্থনীতি যেখানে প্রবৃদ্ধি ৩.৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, মূল্যস্ফীতি ১১.৬৬ শতাংশে উঠেছিল, বেসরকারি বিনিয়োগ দশকের সর্বনিম্নে, সেখানে ৩.৬ শতাংশ ঘাটতি কি সত্যিই অতিরিক্ত? ক্রুগম্যান প্রশ্নটা উল্টো করে করতেন: এই অবস্থায় যদি সরকার সংকোচনমূলক বাজেট দিত, তাহলে কি অর্থনীতি আরও ডুবে যেত না?

আগের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ছিল জিডিপির ৩.৩ শতাংশ। নতুন বাজেটে সেটি ৩.৬ শতাংশে বেড়েছে। এই সামান্য বৃদ্ধি সম্প্রসারণমূলক। কিন্তু ইএমার্জিং মার্কেটের বেঞ্চমার্ক বিবেচনায় এটি মাঝারি পর্যায়ের। ভারত, ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় এটি মোটেই অযৌক্তিক নয়। আসল সমস্যা ঘাটতির পরিমাণ নয়, ঘাটতি অর্থায়নের পদ্ধতি।

এই বাজেটে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হচ্ছে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। আগের বছর ছিল এক লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে ঋণ ৬ হাজার কোটি কমছে। এটি ইতিবাচক সংকেত। কিন্তু মোট এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে। এই ঋণের চাপে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ক্রুগম্যান এই ক্রাউডিং আউটের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলতেন।

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে বাজেটে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ। বর্তমান হার ৯ শতাংশের আশেপাশে। অর্থাৎ লক্ষ্যটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এই এপ্রিলে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে। জ্বালানি তেল ও এলএনজির আন্তর্জাতিক দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এই বাহ্যিক চাপ মোকাবেলায় শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়।

বাজেটে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চাল, ডাল, আলু, গরু-মহিষ, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেলসহ মৌলিক খাদ্যপণ্যে এই ছাড়। এটি ক্রয়ক্ষমতার সুরক্ষার জন্য একটি চাহিদা-সমর্থনমূলক পদক্ষেপ। ক্রুগম্যান এই ধরনের নীতিকে সমর্থন করতেন, কারণ এটি দরিদ্র ভোক্তাদের প্রকৃত আয় রক্ষা করে।

বাজেটে ৩R কৌশলের কথা বলা হয়েছে: Recovery & Stabilization, Restoration এবং Reconstruction for Acceleration। প্রথম পর্যায় এক বছর, দ্বিতীয় পর্যায় তিন বছর, তৃতীয় পর্যায় পাঁচ বছর। এই পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনা যুক্তিসঙ্গত। ক্রুগম্যান বলতেন, সংকট কাটাতে ‘স্থায়িত্ব প্রথম, বিস্তার পরে’। কিন্তু সমস্যা হলো, পাঁচ বছরের পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়ন দুর্বল থাকে, তাহলে প্রতিটি সরকার একই গল্প নতুন করে বলে।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে একটু থামা দরকার। এই বাজেটে ২০২৬-২৭-এ ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ৮.৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, এই বছর প্রকৃত প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.১৪ শতাংশে এসেছে। আইএমএফ বলছে ৪.৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ছিল ৪.৮ শতাংশ। ৬.৫ শতাংশের লক্ষ্য তাই সাহসী, কিন্তু বিশ্লেষকেরা সংশয়ী।

ক্রুগম্যানের কাছ থেকে শিক্ষা হলো, প্রবৃদ্ধির সংখ্যা নয়, প্রবৃদ্ধির মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বাজেটে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা এসেছে, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। সরকারি কর্মচারীরা প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোয় ছিলেন। এই বৃদ্ধি তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াবে। তবে একই সাথে মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি করতে পারে। দুটি শক্তির ভারসাম্য নিশ্চিত করা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ-২০২৬’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মধ্যে ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকিসহ বন্ধ কলকারখানা চালু, কৃষি, সিএমএসএমই এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে অর্থায়নের ব্যবস্থা আছে। ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই স্টিমুলাসের ট্রান্সমিশন মেকানিজম কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে ব্যাংকগুলো ঠিকঠাক ঋণ বিতরণ করে কিনা তার উপর।

জ্বালানি ভর্তুকি নিয়ে বাজেটে একটি অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে। বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এলএনজিতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি, সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখা হয়েছে। এই ভর্তুকির অর্থনৈতিক যুক্তি বিতর্কিত। ক্রুগম্যান বলতেন, যদি ভর্তুকি উৎপাদন ব্যয় কমায় এবং চাকরি রক্ষা করে, তাহলে স্বল্পমেয়াদে তা সঠিক নীতি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি শক্তি-দক্ষ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের প্রণোদনা নষ্ট করে।

আইএমএফের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি। পঞ্চম কিস্তির পর ষষ্ঠ কিস্তি আটকে আছে। নতুন প্রোগ্রামের জন্য আলোচনা চলছে। আইএমএফের শর্তের মধ্যে রয়েছে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, ব্যাংকিং সংস্কার এবং বিনিময় হারে নমনীয়তা। এই বাজেটে কর-জিডিপি অনুপাত ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ৯.৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি, কিন্তু আইএমএফ চায় দ্রুত পদক্ষেপ।

শেষ কথা হলো, ক্রুগম্যানের দর্শনে বাজেট বিশ্লেষণের সঠিক পদ্ধতি হলো, আদর্শ নীতি থেকে বিচার না করে বরং প্রেক্ষাপটের বিপরীতে বিচার করা। এই প্রেক্ষাপটে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট সাহসী, কিন্তু অতিরিক্ত নয়। ঘাটতি উদ্বেগজনক, কিন্তু অসহনীয় নয়। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী, কিন্তু অসম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বাস্তবায়ন ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতা এড়াতে পারলে এই বাজেট বাংলাদেশের পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ হতে পারে।


লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক