ফোনের স্ক্রিনে যেভাবে ইতিহাস জানল কেপ ভার্দে

কেপ ভার্দের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খবরটি এলো কোনো গোল থেকে নয়, কোনো স্টেডিয়াম ঘোষণাতেও নয়। এলো একটি মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। হিউস্টনের মাঠে সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর কেপ ভার্দের খেলোয়াড়েরা দাঁড়িয়ে ছিলেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। নিজেদের কাজ তারা করে ফেলেছেন, কিন্তু শেষ ৩২ নিশ্চিত কি না, সেটি জানতে অপেক্ষা ছিল স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচের ফলের।
মাঠের মাঝখানে একসঙ্গে জড়ো হলেন খেলোয়াড় ও স্টাফরা। কারও হাতে মোবাইল। সবার চোখ সেই ছোট্ট স্ক্রিনে। কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা মনে হচ্ছিল অনন্ত সময়। তারপর এল সেই খবর: স্পেন ১-০ গোলে হারিয়েছে উরুগুয়েকে। কেপ ভার্দে উঠে গেছে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ।
এরপর আর আবেগ ধরে রাখা যায়নি। খেলোয়াড়েরা লাফিয়ে ওঠেন, একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন, কেউ দৌড়ান, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। গ্যালারিতে থাকা কেপ ভার্দের সমর্থকেরাও বুঝে যান, অসম্ভব বলে মনে হওয়া স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলতে এসে নকআউটে পৌঁছে গেছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি।
সৌদি আরবের বিপক্ষে ০-০ ড্র কাগজে-কলমে হয়তো খুব আকর্ষণীয় ফল নয়। কিন্তু কেপ ভার্দের জন্য সেটিই ছিল ইতিহাসের দরজা খুলে দেওয়ার চাবি। গ্রুপ ‘এইচ’-এ তাদের তিন ম্যাচের ফলই ড্র। স্পেনের সঙ্গে ০-০, উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২, আর সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০। জয়ের দেখা না পেলেও হারেনি তারা। সেই অপরাজিত পথই তাদের নিয়ে গেছে শেষ ৩২-এ।
গ্রুপের শেষ ম্যাচে কেপ ভার্দের হিসাব ছিল পরিষ্কার। সৌদি আরবের বিপক্ষে পয়েন্ট নিতে হবে, আর আশা করতে হবে উরুগুয়ে যেন স্পেনকে না হারায়। তারা নিজেদের ম্যাচে পয়েন্ট পেয়েছে। অন্য মাঠে স্পেনের জয় তাদের স্বপ্ন পূরণ করেছে।
এই সাফল্যের মাহাত্ম্য আরও বড়, কারণ কেপ ভার্দে মাত্র প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের দেশ। আটলান্টিক মহাসাগরের আফ্রিকান দ্বীপমালা থেকে উঠে আসা এই দল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের পরিচয় তৈরি করেছে শৃঙ্খলা, সাহস আর অবিশ্বাস্য মানসিকতায়।
কেপ ভার্দে কোচ বুবিস্তা ম্যাচের আগেই বলেছিলেন, বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের বড় দেশগুলোর জন্য নয়, সবার জন্য। তাঁর দল যেন মাঠে সেই কথারই প্রমাণ দিল। স্পেনকে আটকে দেওয়া, উরুগুয়ের বিপক্ষে লড়াই করে ফেরা এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে দরকারি ফল বের করে নেওয়া, সব মিলিয়ে কেপ ভার্দের পথচলা নতুন বিশ্বকাপ ফরম্যাটের সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি।
ম্যাচসেরা দেরয় দুয়ার্তের কথাতেও ছিল সেই বিস্ময়। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, এটা পাগলাটে। মনে হচ্ছে স্বপ্নে আছি।’ ছোটবেলা থেকে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। আর এখন সেই স্বপ্ন শুধু অংশগ্রহণে আটকে নেই; তার দেশ পৌঁছে গেছে নকআউটে।
দুয়ার্তে অবশ্য উদ্যাপনের মাঝেও পরের পরীক্ষার কথা ভুলে যাননি। তার ভাষায়, ‘আগে উদ্যাপন করি। আমরা খুব খুশি। কাল থেকে পরের ম্যাচে মন দেব।’ তারপর আর্জেন্টিনার কথা উঠতেই তার উত্তর, ‘কঠিন ম্যাচ, কিন্তু বিশ্বাস রাখতে হবে। সবকিছু সম্ভব।’
নকআউটে ওঠার পুরস্কারও বিশাল। শেষ ৩২-এ তাদের সামনে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ৩ জুলাই মায়ামিতে লিওনেল মেসিদের বিপক্ষে খেলবে কেপ ভার্দে। যে দল ফোনের স্ক্রিনে নিজেদের ইতিহাস জানতে পেরেছিল, সেই দল এখন মুখোমুখি হবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের।
ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দে শিবিরে আবেগের সঙ্গে ছিল বিশ্বাসও। তারা জানে, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কাজটি কঠিন। কিন্তু এই বিশ্বকাপেই তারা দেখিয়েছে, নামের ভারে ভেঙে পড়ার দল নয়। স্পেনের বিপক্ষে তারা রক্ষণে শৃঙ্খলা দেখিয়েছে, উরুগুয়ের বিপক্ষে সাহস দেখিয়েছে, সৌদি আরবের বিপক্ষে দেখিয়েছে স্নায়ুর জোর।
কেপ ভার্দের এই গল্প নতুন বিশ্বকাপ ফরম্যাটের সবচেয়ে সুন্দর বিজ্ঞাপনগুলোর একটি। বড় দল, বড় তারকা, বড় ইতিহাসের ভিড়ে ছোট দেশও যে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে, সেটাই দেখিয়েছে তারা। তাদের শেষ ৩২-এ ওঠা শুধু ফুটবলীয় সাফল্য নয়, এটি এক দেশের আবেগ, অপেক্ষা আর বিশ্বাসের গল্প।
শেষ বাঁশির পর মাঠে দাঁড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনে ফলের অপেক্ষা। তারপর কান্না, উল্লাস, আলিঙ্গন। কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ রূপকথা যেন এক সিনেমার দৃশ্য। আর সেই সিনেমার পরের দৃশ্য আরও বড়: সামনে মেসির আর্জেন্টিনা।






