ইরানের জয়সূচক গোল কেন বাতিল করল ভিএআর

ইরান ভেবেছিল তারা ম্যাচটি জিতে গেছে। যোগ করা সময়ে শোজা খলিলজাদেহ বল জালে পাঠাতেই শুরু হয়েছিল উল্লাস। সেই গোল থাকলে ইরানের শেষ ৩২-এর পথ নিশ্চিত হয়ে যেত। কিন্তু ভিডিও সহকারী রেফারির পরীক্ষায় গোলটি বাতিল হয় অফসাইডে। মিসর-ইরান ম্যাচ শেষ হয় ১-১ ড্রয়ে। মিসর উঠে যায় শেষ ৩২-এ, আর ইরানের নকআউট ভাগ্য ঝুলে থাকে অন্য ম্যাচের ফলের ওপর।
প্রথম দেখায় সিদ্ধান্তটি অনেকের কাছেই কঠিন মনে হতে পারে। কারণ খলিলজাদেহ যখন বল জালে পাঠান, তখন তাকে অনসাইড মনে হচ্ছিল। মিসরের কয়েকজন খেলোয়াড়ও গোলের কাছাকাছি ছিলেন। কিন্তু ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী অফসাইড বিচার করা হয় না খলিলজাদেহর শট নেওয়ার মুহূর্তে। বিচার করা হয়, তার সতীর্থ যখন আগের শটটি নিয়েছিলেন, সেই মুহূর্তে খলিলজাদেহ কোথায় ছিলেন।
ঘটনাটি ছিল এমন: ইরানের আক্রমণে একটি শট নেন মোহাম্মদ ঘোরবানি। মিসর গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর সেই শট ঠেকান। বল রিবাউন্ড হয়ে যায় খলিলজাদেহর কাছে। তিনি কাছ থেকে বল জালে পাঠান। কিন্তু ভিডিও সহকারী রেফারির চোখ ছিল ঘোরবানির শট নেওয়ার মুহূর্তে খলিলজাদেহর অবস্থানের ওপর।
অফসাইড আইনের মূল কথা হলো, সতীর্থ বল খেলার বা টাচ করার মুহূর্তে আক্রমণকারী যদি বল এবং প্রতিপক্ষের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছে থাকেন, তাহলে তিনি অফসাইড অবস্থানে থাকবেন। সাধারণ পরিস্থিতিতে গোলরক্ষক থাকেন শেষ প্রতিপক্ষ হিসেবে, আর শেষ ডিফেন্ডার থাকেন দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ হিসেবে। কিন্তু এই ঘটনার বিশেষত্ব এখানেই।

মিসরের গোলরক্ষক শোবেইর তখন নিজের গোললাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে অফসাইড লাইন নির্ধারণে শুধু গোলরক্ষককে ধরে সহজ হিসাব করা যায়নি। তখন দেখতে হয়েছে গোলের দিকে থাকা মিসরের দ্বিতীয়-শেষ প্রতিপক্ষ কে এবং তার তুলনায় খলিলজাদেহ কোথায় ছিলেন। ভিডিও পরীক্ষায় দেখা যায়, ঘোরবানি শট নেওয়ার মুহূর্তে খলিলজাদেহ সেই লাইন সামান্য পেরিয়ে ছিলেন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রিবাউন্ড। অনেকেই ভাবতে পারেন, গোলরক্ষক বল ঠেকানোর পর নতুন খেলা শুরু হয়েছে। কিন্তু অফসাইড আইনে গোলরক্ষকের সেভ বা রিবাউন্ড থেকে বল পাওয়া আক্রমণকারীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনসাইড করে দেয় না। যদি তিনি সতীর্থের আগের শটের সময় অফসাইড অবস্থানে থাকেন এবং পরে সেই রিবাউন্ড থেকে বল খেলেন, তাহলে সেটি সুবিধা নেওয়া হিসেবে অফসাইড হতে পারে।
তাই খলিলজাদেহর গোল বাতিলের কারণ ছিল দুটি ধাপের সমন্বয়। প্রথমত, ঘোরবানি শট নেওয়ার মুহূর্তে তিনি বল ও প্রতিপক্ষের দ্বিতীয়-শেষ খেলোয়াড়ের চেয়ে গোললাইনের কাছাকাছি ছিলেন। দ্বিতীয়ত, শোবেইরের সেভ থেকে রিবাউন্ড পেয়ে তিনি সরাসরি খেলায় জড়িয়ে পড়েন এবং গোল করেন। এই কারণেই ভিডিও সহকারী রেফারি গোলটি বাতিল করে।
আরও সহজভাবে বললে, খলিলজাদেহ অফসাইড ছিলেন না যখন তিনি নিজে শট নেন। তিনি অফসাইড ছিলেন যখন তাঁর সতীর্থ ঘোরবানি আগের শটটি নিয়েছিলেন। গোলরক্ষকের সেভ সেই অফসাইড অবস্থান মুছে দেয়নি। তাই গোলটি বৈধ হতো যদি সেই মুহূর্ত খলিলজাদেহ অনসাইডে থাকতেন। (নিচের ছবি দেখুন)

ম্যাচের প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্তটি ছিল বিশাল। মিসর ৫ মিনিটে মাহমুদ সাবেরের গোলে এগিয়ে যায়। ১৪ মিনিটে রামিন রেজায়েয়ান ইরানকে সমতায় ফেরান। এর আগে মেহদি তারেমি পেনাল্টি মিস করেছিলেন। শেষ দিকে তারেমির হেড ক্রসবারে লাগে। এরপর খলিলজাদেহর গোল বাতিল হওয়ায় ইরানের রাত আরও বেশি আক্ষেপের হয়ে ওঠে।
গোলটি বৈধ হলে ইরান ২-১ ব্যবধানে জিতে সরাসরি শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিত। কিন্তু গোল বাতিল হওয়ায় তারা তিন ম্যাচে তিন ড্র নিয়ে গ্রুপে তৃতীয় হয়। এখন তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে সেরা তৃতীয় দলের হিসাবের জন্য।
অন্যদিকে মিসরের জন্য সিদ্ধান্তটি হয়ে ওঠে ইতিহাস রক্ষার মুহূর্ত। ১-১ ড্রয়ে তারা গ্রুপ ‘জি’-এর দ্বিতীয় হয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করে। পরের পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া।
ইরানের জন্য সিদ্ধান্তটি ছিল নির্মম, কিন্তু নিয়মের ব্যাখ্যায় সেটি স্পষ্ট। অফসাইড লাইন ধরা হয়েছে আগের শটের সময়, রিবাউন্ডের সময় নয়। গোলরক্ষকের সেভ নতুন খেলা শুরু করেনি। সেই এক সূক্ষ্ম নিয়মই ইরানের জয়সূচক গোল বাতিল করে এবং তাদের বিশ্বকাপ ভাগ্য অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়।





