গার্ডিয়ানের কলাম/ব্রিটেন কি তবে শাসনের অযোগ্য হয়ে পড়ছে?

ব্রিটেন শাসনের অযোগ্য হয়ে পড়েছে—এমনটা বলা ঠিক হবে না। তবে দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতার পেয়ালাটি এখন এক অদ্ভুত বিষে মাখানো। এই বিষ বড় দ্রুত কাজ করে। এর প্রমাণ হলো গত এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রীর বিদায়। ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে পদত্যাগের ভাষণ দেওয়ার দৃশ্যটি এখন এক চেনা প্রথায় পরিণত হয়েছে।
ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রীদের গড় মেয়াদকাল ছিল দুই বছরেরও কম। কিয়ার স্টারমারের শাসনের অবসানের জন্য ওই ভোট সরাসরি দায়ী নয়। এই পদের জন্য তার নিজস্ব কিছু ঘাটতি ছিল, যার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কোনো সম্পর্ক নেই।
ক্ষমতা হাতে নিয়ে তিনি আসলে কী করতে চান, তা নিয়ে তার নিজের মনেই কোনো স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। নিজেকে আরও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার যে দাবি ছিল, তিনি বরং তাতে বিরক্ত হতেন।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী এই কঠিন সময়ে তার এই দুর্বলতাগুলো আরও নির্মমভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এক দশক ধরে চলা আস্থার সংকটের মুখে তার সীমাবদ্ধতাগুলো আর আড়াল থাকেনি।
যখন রাষ্ট্রের সম্পদগুলো কোনো আত্মঘাতী নীতি বাস্তবায়নে অপচয় করা হয়, তখন দেশ চালানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্যকে ইউরোপের অভিন্ন বাজার থেকে আলাদা করা এবং বাণিজ্যে বাধা দেওয়ার মতো নতুন সব ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় দেশের কূটনৈতিক সঞ্চয় ও অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, সবই ধুলোয় মিশেছে। গণভোটের আগের গতিধারা বজায় থাকলে ব্রিটেন আজ কতটা সমৃদ্ধ হতো, তার হিসাব করলে দেখা যায় দেশটি তার জিডিপির প্রায় ৪ থেকে ৮ শতাংশ হারিয়েছে।
কেবল জিডিপির ওই সংখ্যা দিয়ে ব্রিটেনের এই মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয় পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এখন রাজনৈতিক বিতর্কগুলো স্থূল হয়ে পড়েছে। বাড়ছে চরমপন্থা আর সামাজিক বিভাজন।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বিষিয়ে গেছে। যে আন্দোলন দারিদ্র্যকে ‘মুক্তি’ হিসেবে প্রচার করেছিল, সবকিছু বিগড়ে যাওয়ার পর তারাই এখন পরাজয়ীদের ওপর দায় চাপাচ্ছে। বিজয়ীদের অলীক কল্পনাকে মেনে না নেওয়ায় এখন পরাজিত পক্ষকেই দোষারোপ করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা আর সামাজিক অস্থিরতা থেকে জন্ম নেওয়া জনতুষ্টিবাদ এখন কেবল ব্রিটেনের সমস্যা নয়। অনেক গণতান্ত্রিক দেশই বর্তমানে এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিকরা ব্রেক্সিটকে ইউরোপ ও আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অংশ হিসেবেই দেখবেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উদারবাদী বিশ্বায়ন যখন নিজেকে অপরাজেয় মনে করে আত্মতুষ্টিতে ভুগছিল, ঠিক তখনই এই জাতীয়তাবাদের পাল্টা আঘাত আসে।
জনতুষ্টিবাদের এই লক্ষণ সব দেশেই কমবেশি দেখা যাচ্ছে। তবে একেক দেশে এর বহিঃপ্রকাশ একেক রকম। ব্রিটেনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি করেছে গণভোট। সাধারণ নির্বাচনে কোনো উগ্র দল বা জনমোহিনী নেতা ক্ষমতায় এলে ভোটাররা পরে তাদের সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ পান।
কারণ সেখানে কাজের ওপর ভিত্তি করে জনসমর্থন বাড়ে বা কমে। যেমন, হাঙ্গেরিতে দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর এ বছর ভিক্টর অরবানকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু গণভোটে এমন সুযোগ নেই।
ব্রেক্সিটপন্থিরা এই ভোটের ‘চূড়ান্ত রায়’ হওয়াটাকেই তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ব্রেক্সিট যে একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল—তার পাহাড়সমান প্রমাণ থাকার পরও লাভ হয়নি। কারণ এই সিদ্ধান্তের সঙ্গেই চিরকাল বাস করতে হবে এবং একে ‘জনগণের ইচ্ছা’ হিসেবে মেনে নিতে হবে—এমন এক যুক্তি ভোটারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ব্রেক্সিটের পরিণাম আসলে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা গণভোটের ব্যালট পেপারে লেখা ছিল না। এমনকি প্রচারণার সময়ও এর প্রভাব নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। যেসব ক্ষোভ থেকে ব্রেক্সিটপন্থিরা ভোটারদের জড়ো করেছিল, ইইউ থেকে বেরিয়ে গিয়ে তার কোনোটিই মেটানো সম্ভব ছিল না।
দেশকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করা কিংবা বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী ফোরাম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া কখনোই ‘নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া’র পথ হতে পারে না। বরং এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্য বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব খাটানোর সক্ষমতাই হারিয়েছে।
ভুল পথে চলার এই ফল এখন অত্যন্ত ভয়াবহ। ব্রাসেলসকে এক ‘কল্পিত শোষক’ সাজিয়ে এক ধরণের মুক্তি সংগ্রামের কথা প্রচার করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে ব্রেক্সিটকে দেশপ্রেম প্রমাণের লড়াইয়ে পরিণত করা হয়।
কিন্তু বিজয়ীদের সেই লক্ষ্য যখন শেষ পর্যন্ত এক অন্ধগলিতে গিয়ে পৌঁছাল, তখন এই আন্দোলন টিকিয়ে রাখতে তারা নতুন ‘শত্রু’ খুঁজতে শুরু করল। এটি এক পুরানো ইতিহাস। যখনই কোনো বিপ্লব তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়, তখনই অন্তর্ঘাতক, গাদ্দার কিংবা ‘জনগণের শত্রু’দের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা চলে।
হতাশা যত দীর্ঘ হয়, ‘বলির পাঁঠা’ খোঁজার চেষ্টাও তত হিংস্র হয়ে ওঠে। নাইজেল ফারাজ ১০ বছর আগে তার সেই ‘ভিশনারি’ অর্জনের সাফল্যে তৃপ্ত হয়ে বসে নেই। বরং অভিবাসনকে কীভাবে দেশের সব দুর্দশার কারণ হিসেবে দেখানো যায়, তিনি এখন সেই প্রতিহিংসামূলক পথ খুঁজছেন।
ব্রেক্সিট প্রচারণার সময় যে বর্ণবিদ্বেষ প্রচ্ছন্ন ছিল, তা এখন একদম স্পষ্ট। রিফর্ম ইউকে-র আবাসন নীতিতে ‘শ্বেতাঙ্গ-বিরোধী’ বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার ফন্দি আঁটা হচ্ছে। অনেককেই উচ্ছেদ করে দেশছাড়া করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটি মূলত জাতিগত নিধনের মাধ্যমে আবাসন সংকট মেটানোর এক নীলনকশা।
এই চরমপন্থা মোকাবিলায় কিয়ার স্টারমারের ব্যর্থতা তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিরোধী দলে থাকাকালে তিনি ব্রেক্সিট নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে এক ধরণের ‘ট্যাবু’ বা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। সরকারে আসার পর তার সেই মনোভাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘ফারাজবাদ’ বা উগ্র জাতীয়তাবাদকেই উসকে দিয়েছে।
রিফর্ম ইউকে-র ভোটারদের টানতে গিয়ে তিনি রক্ষণশীলদের সেই ব্যর্থ কৌশলই বেছে নিয়েছিলেন। নাইজেল ফারাজের যুক্তিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি আসলে ফারাজের হাতকেই শক্তিশালী করেছেন।
উগ্র ডানপন্থিদের এই আস্ফালন ঠেকাতে স্টারমার কিছুই করেননি—তা বলা ঠিক হবে না। তবে তিনি সঠিক পথটি খুঁজে পাওয়ার আগে বেশ কয়েকবার ভুল পথে হেঁটেছেন। একসময় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ব্রিটেন ‘অচেনাদের দ্বীপ’ হতে চলেছে। তার এই মন্তব্য উগ্র বর্ণবাদী রাজনীতিক ইনোক পাওয়েলের সুরের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।
তখন নিজের দলের ভেতরেই ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। তবে গত বছরের লেবার কনফারেন্সে তার কণ্ঠে পরিবর্তনের সুর শোনা যায়। তিনি এমন এক দেশপ্রেমের কথা বলেন যা মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও গর্বের ওপর ভিত্তি করে গড়া। ফারাজের নেতিবাচক রাজনীতি আর ঘৃণার বিপরীতে তিনি পারস্পরিক বোঝাপড়া আর সেবার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তবে স্টারমারের কথা সেই মিলনায়তনের দেয়াল ছাড়িয়ে খুব একটা বাইরে পৌঁছাতে পারেনি। মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী আবেদন তৈরির কোনো কৌশলই তার জানা ছিল না। এই দিক থেকে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। মানুষের কাছে কথা পৌঁছে দেওয়ার এক সহজাত ও সাবলীল ভঙ্গি রয়েছে তার।
তবে রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া জাতীয়তাবাদের বিষ ঝেড়ে ফেলতে কেবল সুন্দরভাবে কথা বলাই যথেষ্ট নয়। ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ নীতির কারণেই মূলত যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। কাজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকলেই কেবল মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব। আপনি নিজে যখন কোনো লক্ষ্য সম্পর্কে অস্পষ্ট থাকবেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে তা আবেগ দিয়ে প্রচার করা খুব কঠিন।
বার্নহ্যামও হয়তো ভুল করতে পারেন। তবে তিনি অন্তত জানেন তার আসল প্রতিপক্ষ কে। মেকারফিল্ডে ‘রিফর্ম ইউকে’-র সঙ্গে সরাসরি লড়াই করেই তিনি এই পদের জন্য নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। একে তার ছোটখাটো এক জনদেশও বলা যেতে পারে।
স্টারমার যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন ভেবেছিলেন ব্রেক্সিট ইস্যুকে তিনি পেছনে ফেলে এসেছেন। জাতীয় পরিচয় নিয়ে যে এক ধরণের গভীর দ্বন্দ্ব চলছে, তা তিনি টেরই পাননি।
তিনি বুঝতে পারেননি যে গণভোট-পরবর্তী লড়াইটি আসলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের কোনো বিতর্ক ছিল না। বরং এটি ছিল ঘৃণা ও বর্ণবিদ্বেষ ছড়ানো এক আদর্শিক গোষ্ঠীর হাত থেকে দেশপ্রেমকে উদ্ধার করার লড়াই।
এমন এক দেশে বার্নহ্যামের পক্ষে জেতা সম্ভব, যেখানে অধিকাংশ মানুষ তাদের বন্ধু বা প্রতিবেশীকে দেশান্তরি করার কথা ভাবে না। ব্রেক্সিটের এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে বার্নহ্যামকে এই লড়াইয়ে জিততেই হবে। ডাউনিং স্ট্রিটে দীর্ঘ সময় টিকে থেকে বড় কোনো অর্জন নিশ্চিত করতে চাইলে এর কোনো বিকল্প নেই তাঁর সামনে।
লেখক পরিচিতি
রাফায়েল বেহর দ্য গার্ডিয়ানের একজন কলামিস্ট।






