গ্লোবাল টাইমসের কলাম/তারেক রহমানের সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও গভীর করবে

লিউ জোংই
তারেক রহমানের সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও গভীর করবে
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত চীন সফর করছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার প্রথম বিদেশ সফর এবং দ্বিতীয় গন্তব্য চীন। এই সফর নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের ধারণা, এ সফরে প্রধান অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্পসহ ১৫টিরও বেশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।

Advertisement

চীন ও বাংলাদেশ ঐতিহ্যবাহী বন্ধু, প্রতিবেশী এবং কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদার। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পঞ্চনীতির ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অংশীদারত্বের একটি উদাহরণ তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রয়েছে। ২০২৪ সালে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে উন্নীত করা হয়। অর্থনৈতিকভাবে, চীন টানা ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। পাশাপাশি চীনে রপ্তানিকৃত বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আঞ্চলিক পর্যায়ে চীন ও বাংলাদেশ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে কাজ করছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় সহযোগিতা আঞ্চলিক সংযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। এছাড়া অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের সঙ্গে যৌথভাবে দারিদ্র্য হ্রাস ও আঞ্চলিক সুশাসন উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়েছে।

তবে এসব অর্জনের পরও চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পথে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রভাব। কিছু পরাশক্তি বাংলাদেশকে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে তারা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, অসম চুক্তিতে স্বাক্ষরের জন্য চাপ দেয় এবং চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা প্রকল্পগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ‘ঋণের ফাঁদ’-এর মতো আখ্যান ব্যবহার করে।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা। তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি উপলব্ধিগত পার্থক্য থেকে সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা এখনও সীমিত। বাংলাদেশের কিছু উচ্চবিত্ত মহল পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। তারা প্রায়ই পশ্চিমা অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও শাসনব্যবস্থাকে অনুসরণ করেন, তবে চীনের উন্নয়নপথ এবং উৎপাদন সক্ষমতাভিত্তিক সহযোগিতার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেন।

অন্যদিকে, কিছু উচ্চবিত্ত মহল চীনের উন্নয়ন মডেল ও সহযোগিতার সুফল স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। পাশাপাশি, কিছু অভ্যন্তরীণ আলোচনায় বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির জন্য একমাত্র ‘চীনা পণ্যের ঢল’-কে দায়ী করা হয়। এতে দেশের সীমিত রপ্তানি বৈচিত্র্য ও উৎপাদন সক্ষমতার মতো কাঠামোগত কারণগুলো উপেক্ষিত থাকে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। এর জন্য উভয় পক্ষের আরও বেশি প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের প্রয়োজন। বিশেষ করে উপলব্ধির ব্যবধান দূর করতে খোলামেলা সংলাপ ও মতবিনিময় বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে বাস্তব অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক সাহস দেখাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী রহমানের এই সফর উভয় দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের গভীরতা তুলে ধরবে।

সফর উপলক্ষে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আলোচিত বিষয়গুলোর ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, উভয় দেশ আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমন্বয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

প্রথমত, শিল্প সহযোগিতা জোরদার করা হবে। চীন তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহিত করে আসছে, যাতে দেশটির শ্রম ব্যয়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে রপ্তানিমুখী উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন করা যায়।

দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল সাউথ ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানো হবে, যা এশীয় শিল্প শৃঙ্খল এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে আরও সহজ করবে। চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো এবং চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা ব্যবস্থার মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশকে অন্যান্য আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করতে পারে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নপথ অনুসন্ধানে সহায়তা করতে উভয় দেশ সুশাসন বিষয়ে বিনিময় জোরদার করতে পারে। রাজনৈতিক দল, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এবং স্থানীয় সরকারগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। উন্নয়নের কোনো সর্বজনীন মডেল নেই। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে আধুনিকায়নের পথ অনুসরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি ও সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে।


গ্লোবাল টাইমস থেকে অনূদিত

লেখক পরিচিতি

সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের পরিচালক।