দ্য গার্ডিয়ানের কলাম/ট্রাম্প হয়তো ইরান চুক্তির গ্লানি সইবেন, কিন্তু নেতানিয়াহুর সামনে বিদায়ঘণ্টা

সাইমন টিসডল
ট্রাম্প হয়তো ইরান চুক্তির গ্লানি সইবেন, কিন্তু নেতানিয়াহুর সামনে বিদায়ঘণ্টা
ছবি: সংগৃহীত

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ বন্ধের যে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে, তাতে সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে।

Advertisement

তাকে এমন এক ব্যক্তি হিসেবে মনে রাখা হবে, যিনি মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। গাজার হামাস হোক, পশ্চিম তীরের অবৈধ দখলদারিত্ব, লেবাননের হিজবুল্লাহ কিংবা তেহরানের কট্টরপন্থী সরকার— সব সমস্যার ক্ষেত্রেই নেতানিয়াহুর একটাই ‘সমাধান’ ছিল। সেটি হলো– চরম এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনবহির্ভূত সহিংসতা। তবে তার এই পথ সবসময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ যুদ্ধ ছিল নেতানিয়াহুর ‘পাশবিক শক্তি প্রয়োগের’ নীতির চূড়ান্ত রূপ। কিন্তু যেমনটা অনুমিত ছিল সে অনুসারেই এটি ব্যর্থ হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ভার্সাইয়ে যে যুদ্ধবিরতি সমঝোতা সই করেছেন, তা যে এক ধরনের আত্মসমর্পণ— সেটি আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তিনি।

তবে বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নিয়ে উপহাস চললেও, নেতানিয়াহুর জন্য এর ফল হতে পারে তার ক্যারিয়ারের সমাপ্তি। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন এই প্রধানমন্ত্রী কার্যত এখন এক ‘অতীতের মানুষে’ পরিণত হয়েছেন।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবন এখন একটি অপরাধনামার মতো। কয়েক দশক ধরে তিনি ফিলিস্তিন সংকটের ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ আটকে রেখেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, এরপর গাজায় চালিয়েছেন বীভৎস প্রতিশোধমূলক ধ্বংসযজ্ঞ। উগ্র ডানপন্থীদের সরকারে ঠাঁই দিয়ে তিনি নিজ দেশের জন্য স্থায়ী গ্লানি বয়ে এনেছেন।

এছাড়া ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি নস্যাৎ করে তিনি ট্রাম্পকে দিয়ে ইরানকে খেপিয়ে তুলেছিলেন, যার ফলে এ বছরের বিপর্যয়কর যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পতন ত্বরান্বিত হওয়ার মূল কারণটি অন্য জায়গায়। তিনি ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিশেষ সম্পর্ক’কে বিষিয়ে তুলেছেন। বর্তমানে ট্রাম্পের সঙ্গে তার কথা বলাও প্রায় বন্ধ। হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন জনগণ এখন মনে করে, নেতানিয়াহুই যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অন্তহীন যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছেন।

তিনি খুব সহজেই জয়ী হওয়া ও ইরানি সরকারের পতন ঘটানোর যে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা বুমেরাং হয়েছে। এখন যখন শান্তির সুযোগ এসেছে, তখন লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে নেতানিয়াহু তা নস্যাৎ করার চেষ্টা করছেন বলে মার্কিনিরা আশঙ্কা করছেন।

১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির মাঝেমধ্যে সংঘাত হতো।

১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট, আরব যুদ্ধ, শান্তি পরিকল্পনা বা সীমানা ও বসতি স্থাপন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রায়ই মতভেদ দেখা যেত। তবে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সোভিয়েত হুমকি যখন মুছে গেল, তখন দুই দেশের কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থ একই বিন্দুতে এসে মেলে।

এর মূলে ছিল তাদের অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এরপর থেকেই ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তা ব্যাপক হারে বাড়তে শুরু করে এবং ওয়াশিংটনে ইসরায়েলপন্থীদের প্রভাবও বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে ইসরায়েলের প্রধান রক্ষক ও অপরিহার্য মিত্র। অন্যদিকে ইসরায়েলও ওই অঞ্চলে আমেরিকার প্রধান অংশীদারে পরিণত হয়।

২০১৫ সালে এই দীর্ঘদিনের ঐকমত্যে ফাটল ধরতে শুরু করে। সে সময় ইরানের সঙ্গে বারাক ওবামার সমঝোতা ঠেকাতে বিশাল প্রচারণা শুরু করেন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলো।

এ প্রসঙ্গে হারেৎজ পত্রিকার কলামিস্ট জশুয়া লেইফার লিখেছেন, ‘ইসরায়েলপন্থীদের এই বিশাল প্রচারণা পরমাণু চুক্তি থামাতে ব্যর্থ হয়েছিল। উল্টো তারা দুই দলের (রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট) যৌথ সমর্থনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য নষ্ট করে দেয়।’ শীঘ্রই এই গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে রিপাবলিকান পার্টির একটি শাখা হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এই রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হয়। তিনি ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থাকে (পিএলও) অবজ্ঞা করেন, জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করেন এবং গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেন। লেইফার উল্লেখ করেন, ‘ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীদের চেয়েও ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত সাধারণ ডেমোক্র্যাটদের ইসরায়েল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে বেশি ভূমিকা রেখেছেন।’

পরবর্তী সময়ে নেতানিয়াহুর নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ —যেমন উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিকে আলিঙ্গন করা, ভূখণ্ড দখল এবং গাজা, লেবানন ও ইরানে ব্যর্থ যুদ্ধ—পুরোনো ঐকমত্যকে আরও বেশি খণ্ডবিখণ্ড করেছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো এক চাঞ্চল্যকর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রথমবারের মতো দেখা যাচ্ছে যে, ইসরায়েলের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি আমেরিকানদের সহানুভূতি বেশি। অনেকে এখন প্রশ্ন তুলছেন যে এই জোট আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করছে কি না। এমনকি ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধ বা সীমিত করার দাবিও উঠছে।

মজার ব্যাপার হলো, অতীতে যে দুই দল মিলে ইসরায়েলকে সমর্থন করত, এখন তারাই সমালোচনা করছে। বামপন্থী প্রগতিশীলদের পাশাপাশি ট্রাম্পের কট্টর ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্যেও এখন এই সমালোচনার সুর স্পষ্ট।

যদি ট্রাম্পের করা গালিগালাজপূর্ণ ব্যক্তিগত আক্রমণের খবর সত্য হয়, তবে তা দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাসের চরম পতনের প্রতিফলন। এর ফলে তৈরি হওয়া ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। নেতানিয়াহু এমন এক কাজ করেছেন যা তার পূর্বসূরীদের কেউ পারেননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়েছেন। আর এখন তিনিই এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন, যা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে এক গভীর কৌশলগত ফাটল।

ট্রাম্পের এই ইরান চুক্তি অনেক ইসরায়েলিকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। কেবল কট্টরপন্থীরাই নয়, সাধারণ মানুষও এতে অবাক। মূলত নেতানিয়াহুর দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে এই যুদ্ধের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়েছিল।

তার প্রতিশ্রুতি ছিল—ইরানের পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি চিরতরে দূর করা, হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক মিত্রদের গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইরানের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। কিন্তু এর একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইসরায়েলের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস নিয়ন্ত্রিত সরকার এখন আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।

হরমুজ প্রণালিতে ‘ট্রানজিট ফি’ বা পারাপার শুল্ক আদায়ের পরিকল্পনা তারই প্রমাণ।

গত সপ্তাহে জি-সেভেন সম্মেলনের পর ট্রাম্প কার্যত নেতানিয়াহুর সব শর্ত বা ‘রেড লাইন’ মুছে দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখার অধিকার আছে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অংশ হিসেবে তাদের আটকে থাকা বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

লেবাননে অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবিতে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কঠোর ভাষায় নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং মার্কিনিদের নির্দেশ মেনে চলতে বলেছেন। ভ্যান্স এক প্রকার হুমকি দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এখন যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের ‘একমাত্র শক্তিশালী বন্ধু’। এই প্রকাশ্য সংঘাত ইসরায়েলের জন্য এক মহাবিপর্যয়।

নেতানিয়াহু এখন সবদিক থেকে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তিনি যদি ট্রাম্পকে অবজ্ঞা করে নিজের সার্বভৌমত্ব জাহির করতে চান, তবে ইরান আবারও যুদ্ধ শুরু করতে পারে। এতে শান্তি চুক্তিটি নস্যাৎ হয়ে যাবে।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে ইরান গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ালেও মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন দুই পক্ষই আগের যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে রাজি হয়েছে।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহু যদি এখন ট্রাম্পের নির্দেশ মেনে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করেন, তবে ভোটার ও কট্টরপন্থী মিত্রদের কাছে তিনি নিজের সবটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবেন। যে পথেই তিনি হাঁটেন না কেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই ‘বিশেষ সম্পর্ক’ সহজে সেরে ওঠার সম্ভাবনা খুব কম।


দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত

লেখক: সাইমন টিসডল ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান-এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক কলামিস্ট। এর আগে তিনি পত্রিকাটির আন্তর্জাতিক সম্পাদক, যুক্তরাষ্ট্র সম্পাদক ও হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি দ্য গার্ডিয়ান-এর সম্পাদকীয় লেখক (ফরেন লিডার রাইটার) এবং সংবাদমাধ্যম দ্য অবজার্ভার-এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক ছিলেন।